স্বর্গেও যারা স্বর্গীয় সুখ পায় না, তাদের কাছে যেমন স্বর্গের কদর থাকে না, তেমনি ছন্দ না থাকা দলের কাছে ভালো উইকেটেরও সমাদর নেই। হোক তা শারজাহ বা আবুধাবির ব্যাটিং স্বর্গ। টি২০ বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভ রাউন্ডে বাংলাদেশ দলের হয়েছে সেই দশা। শারজায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৭১ রান করা ম্যাচ হারের পর গতকাল আবুধাবিতে ব্যাটিং স্বর্গেও ভালো ব্যাটিং করতে পারেনি। জুটি, ব্যক্তিগত স্কোর বা দলীয় সংগ্রহ- কোনো কিছুতে মন ভরেনি দর্শকদের। বরং ১২৪ রানের পুঁজি নিয়েও বোলাররা চেষ্টা করে গেছেন ইংল্যান্ডকে ঠেকাতে। কিন্তু যে দলে জেসন রয়ের মতো ক্ল্যাসিক ব্যাটার থাকে, স্বল্প পুঁজি নিয়ে সেই দলের সঙ্গে পারে কে। বাংলাদেশও পারেনি। ইংলিশদের কাছে হেরেছে আট উইকেটে। শ্রীলঙ্কার পর ইংল্যান্ডের কাছে ম্যাচ হারে মাহমুদউল্লাহদের স্বপ্ন ফিকে হতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত আমিরাতের মরুতে আরও একবার না মরীচিকা হয়ে যায় সুপার টুয়েলভে ম্যাচ জয়।

ম্যাচের আগের দিনও ইংলিশদের কাছ থেকে সমীহ পেয়েছে বাংলাদেশ। ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জশ বাটলার আবুধাবিকে বাংলাদেশের কন্ডিশনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। ঢাকায় খেলার অভিজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন, এ ধরনের কন্ডিশনে সাকিবরা ভয়ংকর। প্রশংসা করেছিলেন টাইগার তিন অভিজ্ঞ ব্যাটারের। ইংলিশ ওপেনারের এত স্তুতি গাওয়ার ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গণেশ উল্টে গেল। ইংল্যান্ড দল প্রমাণ পেয়ে গেল, মিরপুরের স্পিন ট্র্যাক ছাড়া ভালো মানের উইকেটে খুব বেশি সুবিধা করতে পারে না বাংলাদেশ। নাসুম আহমেদের কথা বিস্মিত হওয়ার মতোই। ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পিচে টার্ন ছিল না। যে দেশের স্পিনাররা পিচের সাহায্য ছাড়া বল টার্ন করাতে পারেন না, সেই দল ১২৪ রানের পুঁজি নিয়ে জেতার আশাও করে না। বরং বাটলার ও জেসনরা যে ক্ল্যাসিক ঢঙে ব্যাট করে ম্যাচ জিতে নিলেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে।

কখনও সোজা ব্যাটে, কখনও কাট করা বল বাউন্ডারিতে গেল ঘাসের আদর গায়ে মেখে। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে বাউন্ডারি লাইনের ওপরে গিয়ে পড়ল তুলে মারা বল। শটগুলো শিল্প হলে জেসন রয় ও জশ বাটলার শিল্পী। ইংলিশ ওপেনিং জুটি ব্যাটিং বিনোদনে ভরিয়ে দিলেন স্বল্পদৈর্ঘ্যের ইনিংসে। ক্রিকেটে ক্ল্যাসিক ব্যাটিং শব্দটি ইংলিশ ব্যাটারদের জন্যই বেশি প্রযোজ্য। চোখজুড়ানো ছবির মতো শট খেলেন তারা। বাটলার ১৮ বলে ১৮ করে নাসুমের শিকার হলেও রয়কে টলানো যায়নি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খেলে দলের জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন। ৩৮ বলে খেলেছেন ৬১ রানের নান্দনিক ইনিংস। যে ইনিংসটি পাঁচ বাউন্ডারি ও তিনটি ওভার বাউন্ডারি দিয়ে সাজানো। টার্গেট ছোট হওয়ায় পাওয়ার ক্রিকেট দেখানোর প্রয়োজন হয়নি ইংল্যান্ডের। ডেভিড মালানরা তাই স্বাভাবিক ব্যাটিং করে ৩৫ বল আগে খেলা শেষ করেন।

আবুধাবির শেখ আবু জায়েদ স্টেডিয়ামে আগে ব্যাট করা দলের স্কোর লো হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা টেনেটুনে করেছিল ৯ উইকেটে ১১৮ রান। এই রান তাড়া করতে শেষ ওভার পর্যন্ত লাগে অজিদের। উইকেটও হারায় পাঁচটি। স্পিন শক্তিতে বলিয়ান বাংলাদেশের ১২৪ রান সেখানে নিরাপদ মনে করা হচ্ছিল। বোলারদের 'আউট অব দ্য বক্স' গিয়ে বোলিং করতে পারলে কিছু একটা হতেও পারত। ইংল্যান্ড দল ব্যাটিংয়ে নামার পর দেখা গেল বল ব্যাটে যাচ্ছে। এলোমেলো শট না খেললে আউট করা সহজ নয়। অথচ সেই উইকেটেই মুড়িমুড়কির মতো উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

মুশফিক-মাহমুদউল্লাহদের বুলির বলি হওয়ার পরও প্রিয় দলকে সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত থাকেননি সমর্থকরা। আমিরাত প্রবাসীরা দূরদূরান্ত থেকে লাল-সবুজে শরীর মুড়ে কাঠখড় পুড়িয়ে আবুধাবিতে এলেন মাহমুদউল্লাহদের সমর্থন দিতে। মুশফিকদের কাছে বেশি কিছু চাওয়া ছিল না তাদের। ব্যাটিং এবং বোলিংয়ে ভালো করলেই আনন্দ করার উপলক্ষ পেয়ে যেতেন তারা। সমর্থকদের প্রত্যাশার কোনো দাবিই মেটাতে পারেননি তারা। ব্যাটিংয়ের শুরুটা হলো ঝলমলে। মঈন আলীর ওপেনিং ওভার থেকে ১০ রান পেল বাংলাদেশ। শেষ দুটি বল বাউন্ডারিতে পাঠালেন লিটন কুমার দাস। পরের ওভারে পেস বোলার ছিলেন এউইন মর্গান। ক্রিস ওকসের ওভার থেকে তিন রান যোগ করে জুটি। মঈন ফিরেই গড়বড় করে দেন সব। তৃতীয় ওভারে জোড়া আঘাত ইংলিশ অফ স্পিনারের। লিটন ও নাঈম ফেরেন সাজঘরে। সাকিব আর মুশফিকেরও জুটি করা হয়নি। অভিজ্ঞ এ দুই ব্যাটারও মরুর বালুতে মুখ লুকান। ওকসের শিকার হন সাকিব। পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে তৃতীয় উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

পাওয়ার প্লের ছয় ওভার থেকে তিন উইকেটে ২৭ রান সংগ্রহ টাইগারদের। বিশ্বকাপে নিজেদের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন পাওয়ার প্লে স্কোর এটি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ২৫ করেছিল দুই উইকেটে। ওমানের বিপক্ষে কিছুটা ভালো করে। পাপুয়া নিউগিনি ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও কাঙ্ক্ষিত রান এসেছিল। অথচ গতকাল রানের গতি বাড়েনি। উইকেট হাতে রেখে ১০ ওভার শেষ করে ৬০ রানে। পরের পাঁচ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে যোগ করে ২৩ রান। স্লগে নাসুম আহমেদ ৯ বলে ১৯ রান না করলে সংগ্রহ আরও ছোট হয়।



মন্তব্য করুন