নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত শেষ। শিগগিরই চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। ওই ঘটনার পর সরাসরি পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ এনে দণ্ডবিধির ৩০২সহ কয়েকটি ধারায় পুলিশ মামলা করেছিল। বিষয়টি ওই সময় জন্ম দিয়েছিল নতুন আলোচনার। এখন 'অবহেলাজনিত মৃত্যু' ধারাতেই প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলেছেন, হত্যার অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। এটি অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা। তারা এও বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটিতে পদে পদে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ছিল। কারখানা কর্তৃপক্ষসহ সেবা সংস্থার কেউ তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। অগ্নিকাণ্ডের পর পুড়ে অঙ্গার হয়ে এত প্রাণহানির নেপথ্যে ছিল কারখানার ফ্লোর ইনচার্জের হঠকারিতা। সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্নিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, তদন্তে চারটি বিষয় গুরুত্বসহকারে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। প্রথমত. আগুনের সূত্রপাত কীভাবে। দ্বিতীয়ত. একই ফ্লোরে কেন দু-একজন ছাড়া অন্য সব শ্রমিকের লাশ পাওয়া গেল। তৃতীয়ত. এটি দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতা। চতুর্থত. অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সংশ্নিষ্ট কার কী ধরনের দায় ছিল। মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার কথা জানিয়েছে সিআইডি।

মামলার তদন্তে কারখানার মালিক মো. আবুল হাসেম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহান শাহ আজাদ এবং প্রকৌশলী মামুনুর রশিদের দায় ও গাফিলতির তথ্য উঠে এসেছে। 'অবহেলাজনিত মৃত্যু' ধারায় পুলিশ প্রতিবেদন দিচ্ছে। এতে কারখানা কর্তৃপক্ষের দায়-দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও প্রতিষ্ঠান নিরাপদ করে তুলতে ব্যর্থতার বিষয় তুলে ধরা হবে। চার্জশিটে কারখানার মালিক-সিইও ছাড়াও সরকারি তিন সংস্থার অবহেলা ও গাফিলতির বিষয় উঠে এসেছে। এগুলো হলো- কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স এবং বিদ্যুৎ বিভাগ। অপরাধের দায় অনুযায়ী সরকারি সেবা সংস্থায় দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের শাস্তির সুপারিশ করা হবে।

সাধারণত দেশে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ আনতে দেখা যায়। তবে হাসেম ফুডস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডে রূপগঞ্জের ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন মজুমদারের করা মামলায় ৩০২ ধারায় সরাসরি হত্যার অভিযোগ আনা হয়। মামলায় কারখানা মালিক হাসেমসহ আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যার উদ্দেশ্যে সামান্য ও গুরুতর জখম করার অভিযোগও আনা হয়েছে। দ বিধির ৩০২, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬ ও ৩০৭ ধারা এতে যুক্ত ছিল।

গত ৮ জুলাই হাসেম ফুডসে অগ্নিকাে ৫৭ জনের প্রাণ ঝরে যায়। এর মধ্যে আগুনে পুড়ে ৫৪ জন ও লাফিয়ে পড়ে তিনজনের মৃত্যু হয়। ডিএনএ পরীক্ষা শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ৫৪ জনের লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাকি তিনজনের লাশ মর্গেই রয়েছে।

অগ্নিকাে র ঘটনায় ৩০২ ধারায় ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন রূপগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। কারখানার মালিক আবুল হাসেম, তার চার ছেলেসহ আটজনকে আসামি করা হয়। মামলাটির তদন্ত প্রথমে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ। এরপর তা সিআইডির কাছে ন্যস্ত হয়। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল।

সিআইডির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, তদন্তে উঠে এসেছে, হাসেম ফুডস লিমিটেডের সব সার্কিট ব্রেকার নিম্নমানের ও নকল ছিল। আগুনের ঘটনায় ভবনের একটি সার্কিট ব্রেকারও কাজ করেনি। এত বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কীভাবে নকল অকেজো সার্কিট ব্রেকার দিনের পর দিন ছিল, তা নিয়ে বিস্মিত তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা। কারখানায় সার্কিট ব্রেকারসহ বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেখভালের জন্য নিয়োজিত কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করেননি। তদন্তে উঠে এসেছে কারখানার নিচতলা থেকে আগুন লেগেছে। আগুনের সূত্রপাত ঘটে অতিরিক্ত তাপে নিচতলার একটি এগজস্ট ফ্যানের তার গলে। সেখানে অনেক দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়ায়। এ ছাড়া ওই কারখানায় আগুন নেভানোর অন্যান্য সরঞ্জামও পর্যাপ্ত ছিল না। কিছুসংখ্যক ফায়ার এক্সস্টিংগুইশার থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তদন্তে এও উঠে এসেছে, পুরো ভবনের বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক ছিল।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট আরেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কারখানা ঘিরে পদে পদে অনিয়ম ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের বিষয়গুলো নিয়ে মালিক কর্তৃপক্ষ কোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি। হাসেম ফুডসের মালিক আবুল হাসেম যদিও সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, তার কর্মচারীরা এসব ব্যাপারে তাকে কখনও অবহিত করেননি। তবে তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, কর্মচারীদের ওপর এর দায় চাপিয়ে নিজের দায় এড়াতে পারেন না হাসেম। এই যুক্তিতে তাকে চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সিআইডি নিবিড়ভাবে এ মামলার তদন্ত করেছে। একাধিক দফায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন নথিপত্রও তারা যাচাই-বাছাই করে দেখেছেন। কারখানা মালিকসহ সরকারি সেবা সংস্থার কর্মকর্তাদের কার কোথায় গাফিলতি ও অনিয়ম ছিল, তা যৌক্তিকভাবে চুলচেরা বিশ্নেষণ করা হয়।

মামলার তদন্তে উঠে আসে, কারখানার চতুর্থ তলার ফ্লোর ইনচার্জ মো. মাহবুবের হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে ৫৭ শ্রমিকের মধ্যে অন্তত ৫০ জন মারা গেছে। তাদের পুড়ে অঙ্গার হওয়া দেহ চতুর্থ তলার একটি ফ্লোর থেকেই পাওয়া যায়। এর কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, আগুন লাগার পর চারতলার ফ্লোর সুপারভাইজার মাহবুব লোহার গেট তালাবদ্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি সবাইকে ডেকে এসি রুমের ভেতরে নেন। ওই রুম থেকে কারও বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। তিনি শ্রমিকদের অভয় দিয়ে বলতে থাকেন- এসি রুমের দিকে আগুন ছড়াবে না। একপর্যায়ে মাহবুবসহ অন্তত ৫০ জন ওই ফ্লোরেই মারা যান। ফ্লোরগেট তালাবদ্ধ থাকায় কেউ সেখান থেকে বের হতে পারেনি। সিআইডি বলেছে, ছাদের গেট তালাবদ্ধ ছিল না। তাই অনেক ফ্লোর থেকে কেউ কেউ ছাদে গিয়ে লাফিয়ে বেঁচে যান। আর তিনজন ছাদ থেকে লাফ দিলেও পড়ে মারা যান।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যারা কারখানাটি পরিদর্শনে সংশ্নিষ্ট ছিলেন, তারা ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করেননি। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের উপমহাপরিদর্শক সৌমেন বড়ুয়া, পরিদর্শক নেছার আহমেদের প্রতারণা ও অনিয়মের তথ্যও পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক শিশু-কিশোর হাসেম ফুডসে কাজ করলেও কেউ এ ব্যাপারে দৃষ্টান্তমূলক কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি। আগুন লাগার পর মামলা করার ক্ষেত্রেও প্রতারণার আশ্রয় নেন। মামলার তারিখ বদল ও শিশু শ্রমিক থাকলেও শ্রম আইনের ২৮৪ ধারায় মালিকপক্ষের দণ্ড চাওয়া হয়নি। অনেকে বলেছেন, এত অনিয়ম নিয়ে কীভাবে দিনের পর দিন কারখানাটি চলছিল, তার দায়ও কোনোভাবে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা এড়াতে পারেন না।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং বিদ্যুৎ বিভাগের ওই সার্কেলের কর্মকর্তারাও তাদের ওপর নিযুক্ত দায়িত্ব পালন করেননি। তারা ঠিকঠাক তাদের নজরদারি ও দায়িত্ব পালন করলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহাণি এড়ানো যেত।

অগ্নিকাণ্ডের পর কারখানার মালিক আবুল হাসেম ও তার চার ছেলে এবং কারখানার তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাদের কয়েক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। এ ছাড়া এ ঘটনায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা সৌমেন বড়ুয়া, নেছার আহমেদ এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক তানহারুল ইসলামকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল সিইআইডি। কারখানার অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার অনেক প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি তারা।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি ইমাম হোসেন সমকালকে বলেন, সেবা সংস্থাসহ কারখানা কর্তৃপক্ষের অনিয়ম, গাফিলতি এবং এ-সংক্রান্ত নথিপত্র বিশ্নেষণ করে মামলার তদন্ত শেষ করে আনা হয়েছে। দ্রুত পুলিশ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে। এটা ঠিক, যদি কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে এতগুলো মৃত্যু আমাদের দেখতে হতো না।



মন্তব্য করুন