হঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহারকে বিচারিক দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে গতকাল রোববার এই নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। পরে এই নির্দেশনা-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। বিধি অনুসারে সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে বিচারক কামরুন্নাহারকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়।

মোছা. কামরুন্নাহার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক হিসেবে গত ১১ নভেম্বর রাজধানীর বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার রায় দেন। রায়ে পাঁচ আসামির সবাইকে খালাস দেওয়া হয়। তবে খালাস নিয়ে যতটা আলোচনা তার চেয়ে বেশি সমালোচনা দেখা দেয় রায়ে বিচারকের পর্যবেক্ষণ নিয়ে। পর্যবেক্ষণে কামরুন্নাহার বলেন, ধর্ষণের অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে পুলিশ যেন মামলা না নেয়। বিচারকের এমন পর্যবেক্ষণ নিয়ে সেদিন থেকেই সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

তারা মনে করেন, এ ধরনের পর্যবেক্ষণ সংবিধান ও আইনবহির্ভূত। কারণ ফৌজদারি মামলায় বিচার চাওয়ার অধিকার সবারই রয়েছে। ধর্ষণের মামলা ৭২ ঘণ্টা পরে দায়েরের সুযোগ সংকুচিত করা হলে ভুক্তভোগীদের হয়রানি আরও বাড়বে। এর সুযোগ নেবে ধর্ষকরা। এ নিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতির পাশাপাশি রাজধানীতে সমাবেশও করে সংগঠনগুলো। তাদের এই দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও।

গত শনিবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এক স্মরণসভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, 'বিচারকের পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক। কারণ, ফৌজদারি অপরাধ তামাদি হওয়ার বিধান নেই। এ কারণে আমি আগামীকাল (রোববার) প্রধান বিচারপতির কাছে তাকে বিচারক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন নিয়ে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সে জন্য একটি চিঠি লিখছি। রোববার এ চিঠি দেওয়া হবে।'

সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, বিচারক কামরুন্নাহারের বিষয়ে ব্যবস্থা চেয়ে প্রধান বিচারপতিকে আইনমন্ত্রী চিঠি দেবেন- গণমাধ্যমে এমন তথ্য প্রকাশ পেলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে অস্বস্তি দেখা দেয়। কারণ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা ও এখতিয়ার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত। এ পর্যায়ে রোববার সকালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আইনমন্ত্রীর চিঠি আসার আগেই বিচারক কামরুন্নাহারের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর হন। তিনি বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে সকাল সাড়ে ৯টায় প্রধান বিচারপতি সংশ্নিষ্ট বিচারক কামরুন্নাহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত দেন।

এদিকে জেলা জজ পর্যায়ের বিচারক কামরুন্নাহারকে প্রত্যাহারের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিচারাঙ্গনে সারাদিন এ নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক চলে। তবে আইনজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে প্রধান বিচারপতি সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে বিচার বিভাগের ওপর নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়বে না।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ প্রসঙ্গে গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ৭২ ঘণ্টা পরে ধর্ষণের মামলা গ্রহণ না করার বিষয়ে বিচারক রায়ে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তা সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার পরিপন্থি। প্রধান বিচারপতিকে আমি কিছু বলিনি। উনি স্বপ্রণোদিত হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আইনজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া :সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, সংশ্নিষ্ট বিচারককে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করাটা ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন তদন্তের জন্য একটি কমিটি হবে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিচার বিভাগের জন্য প্রধান বিচারপতি যেটা সমীচীন মনে করেছেন, সেটাই তিনি করেছেন। বিচার ও রায় প্রদানের ক্ষেত্রে সবাইকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, 'আইনবহির্ভূত কোনোকিছু করা যাবে না। সংশ্নিষ্ট বিচারককে প্রত্যাহারের ঘটনা তারই একটি দৃষ্টান্ত। যা বিচার বিভাগের জন্য ইতিবাচক। সুপ্রিম কোর্ট যদি অধস্তন আদালতের সব বিষয়ে এভাবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে, তাহলে বিচারকরা আরও দায়িত্বশীল হবেন এবং জনগণও বিচার বিভাগের প্রতি পূর্ণাঙ্গ আস্থা ফিরে পাবে।'

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেন, 'সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্ট আইনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবেন, সেটিই সবার জন্য বাধ্যতামূলক ও প্রতিপালনযোগ্য। তার অর্থ এই নয় যে, কোনো আদালত বিশেষত বিচারিক আদালতের কোনো পর্যবেক্ষণ বা আইনের বিশ্নেষণ অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিপালনীয় নয়। সেই বিবেচনায় ধর্ষণ মামলায় আলোচ্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের দেওয়া ৭২ ঘণ্টা সংক্রান্ত মন্তব্যের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। এই মন্তব্যের কারণে ৭২ ঘণ্টা পর পুলিশ আগেও যেমন মামলা নিত, এখনও একইভাবে মামলা নিতে পারবে। আমার মতে, বিচারকের মন্তব্য বা পর্যবেক্ষণ নিয়ে অহেতুক আইনি অস্পষ্টতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।'

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, 'প্রধান বিচারপতি একজন বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন, এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছিল। তখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কিনা সেটা দেখা হোক।'

হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন আইনজীবী এলিনা খান বলেন, 'প্রধান বিচারপতির এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। কারণ, ঘটনার ৭২ ঘণ্টার পর মামলা না নিতে বিচারক পুলিশকে যে র্নিদেশ দিয়েছেন, সেটা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। কোনো বিচারক এ ধরনের নির্দেশনা দিতে পারেন না। বিচারক যদি এ ধরনের নির্দেশনা দেন, সেটা হবে পুলিশের জন্য পোয়াবারো। এমনিতেই ধর্ষণের শিকার একজন নারী থানা-পুলিশের কাছে আসতে পারেন না। থানা-পুলিশও নানা কারণে মামলা নেয় না। তার পর এ ধরনের নির্দেশনা পেলে থানায় চলবে প্রভাবশালীদের টাকার খেলা।'

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, 'সংশ্নিষ্ট বিচারককে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সঠিক ও সময়োপযোগী। কারণ, ওই বিচারক তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। এটা প্রধান বিচারপতির নজরে এসেছে। যেহেতু প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের প্রধান, সেহেতু তিনি সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের সঙ্গে পরামর্শ করে এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তীকালীন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে বিচার বিভাগের ওপর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

ক্ষুব্ধ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা :ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা জজ) মোছা. কামরুন্নাহারকে বিচারিক দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অধস্তন আদালতের একাধিক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিচারক সমকালকে বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী বিচারকরা রায়, আদেশ বা পর্যবেক্ষণ যাই দেন না কেন তিনি সেটা স্বাধীনভাবে দেবেন। এটি তার ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়, আদালতের বিষয়। এর বিরুদ্ধে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তিনি বা তারা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারেন, প্রতিকার চাইতে পারেন। কিন্তু বিচারক কামরুন্নাহারকে যেভাবে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়েছে, তা দুঃখজনক। এর ফলে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। এর আগে পিরোজপুরের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল আউয়ালকে জামিন না দেওয়ার ঘটনায় সংশ্নিষ্ট বিচারককে বদলি করা হয়েছিল। এসব ঘটনা নজিরবিহীন।

যেভাবে কার্যকর হলো প্রত্যাহার আদেশ :গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আকারে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে বিচারক কামরুন্নাহারকেও তা অবহিত করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। সকাল ৯টার দিকে বিচারক কামরুন্নাহার যথারীতি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে হাজির হন। প্রস্তুতি ছিল এজলাসে বসে বিচারকাজ করার। তখন প্রধান বিচারপতির দপ্তর থেকে এজলাসে না বসার মৌখিকভাবে নির্দেশনা পৌঁছায়। ফলে এজলাসে আর ওঠা হয়নি এই বিচারকের।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যাহারের খবর পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিচারক কামরুন্নাহার। এ সময় তিনি শুধু বলেছেন, তার প্রতি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সঠিক হয়নি। আক্ষেপ করে আরও বলেন, আজ তার পুরস্কৃত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তিরস্কার করা হলো। এরপর তিনি বাসায় চলে যান।

কামরুন্নাহারের বিচারিক জীবন :আশির দশকে জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত নাজিম-উদ-দৌলার মেয়ে মোছা. কামরুন্নাহার (কাকলী)। তার স্বামী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোমিনুল ইসলাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই লন্ডন প্রবাসী। এই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বেগম কামরুন্নাহার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে অনার্স ও মার্স্টাস করেন। পরে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের-বিজেএস প্রথম ব্যাচ (বিসিএস ২২তম) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী জজ পদে বিচার বিভাগে যোগ দেন। তিনি গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকার সাত নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকার অন্য একটি সিভিল আদালত এবং ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ এবং রংপুরেও অনেক দিন বিচারিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে কর্মজীবনে ধর্ষণের মামলায় এর আগেও বিচারক কামরুন্নাহার বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ সত্ত্বেও ধর্ষণ মামলায় আসামিকে জামিন দেওয়ার ঘটনায় গত বছরের ১২ মার্চ তাকে তলব করা হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে ওই বছরের ২ এপ্রিল হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। পরে তিনি হাজির হয়ে ক্ষমা চান।

ওই মামলার বিবরণে জানা যায়, রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন বাংলার সাবেক প্রোগ্রাম প্রডিউসার আসলাম শিকদারের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মামলা করা হয়। ওদিনই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ মামলায় ২০১৯ সালের ১৮ জুন হাইকোর্ট তাকে জামিন দেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ জুন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আসলামের জামিন স্থগিত করেন। চেম্বার আদালতে জামিন স্থগিত থাকার পরও গত বছরের ২ মার্চ আসামি আসলামকে জামিন দেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক কামরুন্নাহার।

মন্তব্য করুন