নিরাপদ সড়ক ইস্যুতে গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদের বৈঠক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডায় লিপ্ত হন।

এদিন সংসদের বৈঠকে প্রস্তাবিত 'মহাসড়ক বিল-২০২১'-এর জনমত যাচাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে এমন উত্তাপ ছড়ায়। এ সময় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সব ধরনের গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে আইন করার দাবির পাশাপাশি এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলার অভিযোগ তুলে ধরেন। পাশাপাশি সড়ককে নিরাপদ রাখাসহ সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ক্ষেত্রে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি। জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুও এ নিয়ে সরকারের কিছুটা সমালোচনা করেছেন।

জবাব দিতে এসে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শিক্ষার্থীদের বাসভাড়া অর্ধেক করার দাবি পূরণে সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের কথা তুলে ধরে বলেছেন, বিআরটিসি এমন সিদ্ধান্ত নিলেও সরকার তো বেসরকারি পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের এটাতে বাধ্য করতে পারে না। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ছাত্রলীগ হামলা করেনি বলেও দাবি করেন ওবায়দুল কাদের।

'ছাত্রলীগ হামলা করেনি' :বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, হাফ পাসের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সমাবেশ করেছেন। ছাত্রলীগ দলগতভাবে এই হাফ ভাড়ার সমাবেশে বা মানববন্ধনে হামলা চালাবে, এটা সত্য নয়। ছাত্রলীগ নামধারী কোনো দুর্বৃত্ত হয়তো এ কাজ করতে পারে।

বিএনপির এই সংসদ সদস্যের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, 'যিনি ছাত্রলীগের হামলার কথা বলছেন, তিনি কি কারও নাম বলতে পারেন? এটাই যদি করত, তাহলে তারা কেন বিবৃতি দিয়ে এ দাবিকে প্রকাশ্যে সমর্থন করছে?'

গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ পাসের দাবি প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিসিতে প্রথমে ভেবেছিলাম, ভাড়া ৩০ পারসেন্ট দেব।

কিন্তু যখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি চাইলাম, তিনি বললেন, 'হাফ ভাড়া যখন তারা দাবি করেছে সেটিই দাও'। তার নির্দেশনায় সারাদেশে বিআরটিসির প্রজ্ঞাপন দিয়েছি। ১ ডিসেম্বর থেকে এটি কার্যকর হবে।

তিনি বলেন, 'বেসরকারি যে গণপরিবহন রয়েছে, তাদের ওপর আমরা জোর করে চাপাতে পারি না। তারা তো সরকারের অধীনে না। সরকারের সঙ্গে হয়তো কাজ করে। বেসরকারি গণপরিবহনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত তাদের নেওয়া দরকার। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় তাদের অনুরোধ করা হয়েছে।'

রুমিন ফারহানার নানা অভিযোগ খ ন করে ওবায়দুল কাদের বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক কিছু অ্যাডজাস্ট করতে হয়। পরিস্কারভাবে একটি সত্য কথা বলতে চাই। এখানে অনেক সমস্যা আছে। যখন চেয়ারে বসবেন, অনেক কিছু মোকাবিলা করতে হয়। একটা চ্যালেঞ্জিং জব। এখানে আমরা কিছু কিছু বিষয় অ্যাডজাস্ট করি; কিন্তু সংসদে যেটা বলা হয়েছে, তা মোটেও ঠিক নয়।

তিনি বলেন, সংসদ সদস্য আইনটির সংশোধিত রূপটি এখনও দেখেননি। এটা সংসদে আসেনি। ওয়েবসাইটে আছে। আইন শাখা এটা এরই মধ্যে ভেটিং করেছে। তার পরও ওয়েবসাইটে রাখা হয়েছে, মতামতও নেওয়া হচ্ছে। তিনজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা খুব সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সংশোধিত রূপ দাঁড় করানো হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, 'আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই- এই আইনে সাজার শৈথিল্য বা কঠোরতা কোনোভাবেই শিথিল করা হয়নি। কোনো সাজা কমানো হয়নি। আইনের যে কঠোরতা ও স্পিরিট, অরিজিনাল আইনে যা ছিল সেটাই আছে। সেটাই থাকবে। শুধু ভাষাগত ও প্রতিশব্দের বিষয় এবং প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটিকে আমরা যুগোপযোগী করেছি। এ ছাড়া অন্য কিছু এখানে নেই। এখানে সাজা কমিয়ে কাটছাঁট করে কারও সঙ্গে প্রতারণা করিনি।'

তিনি বলেন, জনবান্ধব শেখ হাসিনার সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে না। এই সরকার জনস্বার্থেই কাজ করে।

সড়কে দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সড়কের দুর্ঘটনা বন্ধ শুধু সরকারের একার কাজ নয়, সবার সহযোগিতা দরকার। সাধারণরা আইন মানলেও অনেকে ভিআইপি হয়ে রংসাইডে যেতে চান। সেখানে কি সড়কের শৃঙ্খলা থাকবে? মা তার শিশুকে কোলে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আইল্যান্ড ক্রস করছেন। মোবাইল ফোন কানে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। তাহলে দুর্ঘটনা হবে না? এ জন্য কি শুধু চালকরা দায়ী? বেপরোয়া ড্রাইভিংও অবশ্যই দায়ী সেটা অস্বীকার করছি না। কিন্তু জনগণ, যারা রাস্তা ব্যবহার করেন তারাও সচেতন নন। শুধু চালক নন, পথচারীরাও বেপরোয়া হয়ে যান।

তিনি বলেন, নিরাপদ সড়ক আমরাও চাই। এই নিরাপত্তার জন্য বিলটি আনা হয়েছে। রাস্তায় শৃঙ্খলার জন্য বিল আনা হয়েছে। ডিসিপ্লিন সড়কে দরকার, পরিবহনেও দরকার।

আইন করার দাবি :এর আগে 'মহাসড়ক বিল, ২০২১'-এর সংশোধনের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সব ধরনের গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া প্রচলন করতে জাতীয় সংসদে আইন পাস করার দাবি করেন। রুমিন ফারহানা আরও বলেন, সড়ক নিরাপত্তা দেওয়ার দাবির সঙ্গে সঙ্গে হাফ পাসের একটা দাবি বহুদিন শিক্ষার্থীরা করছেন। অর্থাৎ অর্ধেক ভাড়ায় যেন শিক্ষার্থীরা চলতে পারেন। সম্প্রতি দেশের শহর এলাকার কিছু বাসে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নেওয়া হয়। কিন্তু এটা নিয়ে কোনো আইন বা নীতিমালা না থাকায় ভাড়া বাড়ানোর পর সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বাস ভাড়া বাড়ানোর পর মালিকপক্ষ হাফ ভাড়া বন্ধ করে দিয়েছে। এই জেরে শিক্ষার্থীরা পথে নেমে এসেছেন। কিন্তু তাদের ওপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তিন বছর আগে যখন আন্দোলন হয়েছিল, তখন হেলমেট পরে তারা চেহারা লুকানোর চেষ্টা করেছিল। এবার যখন ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন হেলমেট পরা দেখিনি।

বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, আইন মেনে ব্যবসা করতে হয় ব্যবসায়ীদের। সরকার বলে বেসরকারি গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের নেই। কথাটি সঠিক বা সত্য নয়। কারণ সরকার যদি ব্যবসার জন্য কোনো আইন করে, সেটা মেনে নিয়ে ব্যবসা করতে হয় ব্যবসায়ীদের।

তিনি বলেন, সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি পরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার আইন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সবাইকে সেটা মানতে হবে। শুধু শহর এলাকার বাসে নয়, সব গণপরিবহনে অবলিম্বে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া দিয়ে যাতায়াতের আইনি বিধান করা হোক।

মহাসড়ক তৈরিতে অতিরিক্ত ব্যয়ে সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, শুধু পাশের দেশ ভারত কিংবা চীন নয়, ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশের সড়ক নির্মাণে বেশি ব্যয় হয়। সেই কারণে এ দেশের মহাসড়ক পৃথিবীর মহাসড়ক বলে মনে হয় না। ভিন গ্রহের মহাসড়ক হতে পারে। ঢাকা-ভাঙ্গা-মাওয়া মহাসড়কের কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয়েছে দুইশ কোটি টাকা, যা পৃথিবীতে নজিরবিহীন।

'দালাল বলে' :মহাসড়ক বিল, ২০২১ পাসের আলোচনায় জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, সরকারের কথা বলতে গিয়ে এমন অবস্থা হয়েছে, পাবলিক এখন তাদের (জাতীয় পার্টি) আওয়ামী লীগের দালাল বলে।

এর আগে বিলের ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্যও সরকারের সমালোচনা করেন। মুজিবুল হকও টঙ্গী-গাজীপুর সড়ক নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করেন না, এটা ঠিক নয়।

তিনি বলেন, 'সরকারের কথা বলতে গিয়ে এমন অবস্থা হয়েছে, মাননীয় স্পিকার, পাবলিক এখন আমাদের আওয়ামী লীগের দালাল বলে। আর কত বলব, বলেন। আমরা এখন দালালি নামটা মুছতে চাই। তার পরও যদি আপনাদের মন না ভরে, তাহলে তো কিছু করার নেই।'

ওবায়দুল কাদেরকে উদ্দেশ করে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ রুমিন ফারহানা বলেন, সরকার রূপসী বালিকার মতো শুধু প্রশংসা শুনতে চায়। তারা ভুলে যায় ৬ লাখ কোটি টাকার বাজেট হয়েছে কাজ করার জন্য। এই কাজের জন্য প্রশংসার দরকার নেই।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বলেন, প্রশংসার কারণে এই সংসদে বিরোধী দলকে চেনাই যাচ্ছে না।

এর আগে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়ে মুজিবুল হক আরও বলেন, এই সরকার অনেক কাজ করেছে। কিন্তু ৭-৮ বছর ধরে টঙ্গী-গাজীপুর সড়কে ভয়াবহ অবস্থা। এখানে যাওয়া যায় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। ইহজগতে এ রাস্তা হয়ে আর যাওয়া যাবে কিনা, তা তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর কাছে জানতে চান।

মন্তব্য করুন