শরতের আকাশের মতো টেস্ট ক্রিকেটের আকাশেও ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। চট্টগ্রাম টেস্টের আকাশ চার দিন চার রকম সম্ভাবনার রঙে সেজেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে বর্ণহীন ইনিংসে পুনর্জীবন লাভে হয়েছে রঙিন। পাকিস্তানকে অলআউট করে লিড পাওয়া ছিল পলাশের লালের মতো উজ্জ্বল। আবার সব রংকে ধূসর করে দিল দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং ব্যর্থতা। উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে শেষ দিনে গড়াল ম্যাচ। অলৌকিক কিছু না হলে ম্যাচে নতুন করে বাঁক নেওয়ার সুযোগ নেই। চতুর্থ দিন শেষে ম্যাচের ফল পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম টেস্ট জিততে যাচ্ছে পাকিস্তান। শেষ দিন ৯৩ রান করলেই জয়ী তারা।

প্রথম ইনিংসে লিড নিয়ে ম্যাচ হারের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। এই চট্টগ্রামেই বছরের প্রথম টেস্টে বড় লিড পেয়েও জিততে পারেননি মুমিনুলরা। পাকিস্তানের বিপক্ষে লিড সেখানে মাত্র ৪৪ রানের। এই রানকেও বড় করা যেত দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটাররা এভাবে ব্যর্থ না হলে। মুশফিকরা এতটাই খারাপ করলেন যে, দুই ইনিংস মিলিয়েও বড় টার্গেট দেওয়া সম্ভব হলো না। পাকিস্তানের মতো পেশাদার দলের সঙ্গে ২০১ রানের পুঁজি নিয়ে লড়াই করা প্রায় অসম্ভব। এই রান নিয়ে লড়াই করতে যে মানের বোলার লাগে, বাংলাদেশের তা নেই। বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম কাছে এমন কোনো জাদুর ঝাঁপি নেই যে, প্রতি ইনিংসে সাত উইকেট করে নেবেন। বাকি বোলারদেরও সমানে পাল্লা দিতে হতো।

আবু জায়েদ রাহি, এবাদত হোসেন বা মেহেদী হাসান মিরাজ যেটা গতকাল পর্যন্ত করে দেখাতে পারেননি। দ্বিতীয় দিনের মতো চতুর্থ দিনও ম্লান ছিলেন বোলাররা। গতকাল ৩৩ ওভার বল করে চিড় ধরাতে পারেনি সফরকারী ওপেনিং জুটিতে। যে কারণে অনায়াসে ১০৯ রানের অবিচ্ছেদ্য জুটি গড়ে বড় জয়ের পথ করে দিলেন আবিদ আলি আর আব্দুল্লাহ শফিক। আজ প্রথম সেশনে সমন্বিত বোলিং করা না গেলে বড় পরাজয় অবধারিত। আবিদ ৫৬ ও শফিক ৫৩ রান নিয়ে আজ মাঠে নামবেন।

ব্যাটিং ও বোলিং দুই দিক থেকেই পার্থক্য গড়ে রেখেছে পাকিস্তান। শাহিন আফ্রিদি, হাসান আলির মতো উইকেটটেকার ফাস্ট বোলার আছে তাদের। আবিদ আলির মতো ধারাবাহিক ব্যাটার ইনিংস ওপেন করেন। বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ সেখানে ছেঁড়া প্যারাসুটের মতো। যে কারণে দুই ইনিংসেই টপঅর্ডার ব্যর্থ। যেটুকু রান এলো মিডল অর্ডার থেকে। ওপেনিংয়ের মতো লোয়ার অর্ডারও নড়বড়ে। মিরাজ ছাড়া জুটি গড়ে তোলার সামর্থ্য প্রমাণ করতে পারেননি লোয়ার অর্ডার ব্যাটাররা। মুশফিকুর রহিম আর লিটন কুমার দাস প্রথম ইনিংসে ২০৬ রানের জুটি গড়ায় ৩৩০ রান করতে পারলেও দ্বিতীয় ইনিংসে লিটন ছাড়া হাফসেঞ্চুরিতে যেতে পারেননি কেউ। অভিষিক্ত ইয়াসির আলী ছন্দে থাকলেও মাথায় বলের আঘাত ম্যাচ থেকে ছিটকে দেয় তাকে। লিটনের সঙ্গে জুটি বেঁধে দারুণ কিছু শটও খেলেন তিনি। ২৯.৫ ওভারে শাহিন শাহর বাউন্সার বল ইয়াসিরের হেলমেটে আঘাত করে। আঘাত নিয়েই দুই ওভার খেলেন ২৫ বছর বয়সী এ ব্যাটার। মাথা ঝিম ধরায় ৩২তম ওভারে মাঠ থেকে উঠে যান তিনি। স্ক্যান রিপোর্টে কোনো সমস্যা ধরা না পড়লেও হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে থাকবেন ডানহাতি এ ব্যাটার। তার জায়গায় কনকাশন সাব হিসেবে খেলেন নুরুল হাসান সোহান। তিনিও লিটনকে সঙ্গ দিতে পারেননি। ধরে এবং ধীরে খেলার দাবি না মিটিয়ে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ক্যাচ হন বাউন্ডারিতে। সোহানের আগেই মেহেদী মিরাজ ফেরেন সাজঘরে। শেষের দিকে নেমে বহু টেস্টে লড়াই করতে দেখা গেলেও পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্যাট হাতে ম্লান তাইজুল। যে কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ অলআউট ১৫৭ রানে। ৪ উইকেটে ৩৯ রানে তৃতীয় দিন শেষ করে স্বাগতিকরা। গতকাল ৬ উইকেট করে ১১৮ রান। লিটন ৮৯ বলে করেন ৫৯ রান। ম্যাচের ৪৮৭ রানের মধ্যে লিটনের অবদান ১৭৩ রান।

সিরিজ শুরুর আগে বাবর আজম ধরেই নিয়েছিলেন ট্রেডিশনাল স্লো এবং টার্নিং উইকেটে খেলা হবে চট্টগ্রাম টেস্ট। সেটা ভুল প্রমাণ হলো চার দিন ভালো ক্রিকেট খেলা হওয়ায়। স্পোর্টিং উইকেটে ব্যাটিং ও বোলিং দুই-ই ভালো হচ্ছে। পেস ও স্পিন দুই বোলিংই কার্যকর ছিল। তাইজুল, হাসান আলি ও শাহিন আফ্রিদি ইনিংসে পাঁচ উইকেট করে নিয়ে সেটার প্রমাণ করেন। প্রথম ইনিংসে হাসান পান পাঁচ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট পেলেন শাহিন শাহ আফ্রিদি। স্বাগতিকদের দ্বিতীয় ইনিংসে ধস নামাতে অফস্পিনার সাজিদ খান তিন উইকেট নিয়ে ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তান পেস শক্তিতে বলীয়ান হলেও বাংলাদেশ সেখানে ফ্লপ। এবাদত হোসেনের বলের লাইন-লেন্থ ঠিক থাকলেও উইকেট নেওয়ার মতো ডেলিভারি দিতে পেরেছেন সামান্যই। টেস্টের মূল পেসার আবু জায়েদ রাহি গতকাল বোলিং পেলেন মাত্র দুই ওভার। মুমিনুলের টেস্ট দলটা এখনও গুছিয়ে উঠতে পারেনি।

মন্তব্য করুন