আবারও ময়লার গাড়ির স্টিয়ারিং চলে গেছে হেলপার-ক্লিনার-সুইপার ও মশককর্মীর হাতে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বর্জ্যের গাড়ির নিচে পড়ে পরপর দু'দিনে দু'জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরে জানা গিয়েছিল, ময়লা টানা ভারী গাড়িগুলো চালায় লাইসেন্সবিহীন বা হালকা গাড়ির লাইসেন্স পাওয়া করপোরেশনের কর্মীরা, এমনকি নিয়োগপ্রাপ্ত চালকদের ভাড়া করা লোকেরা। এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ পেলে অপব্যবস্থাটা থামানো হয়েছিল। কিন্তু দু'দিন পরই শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

কর্তৃপক্ষ বলছে, রাজধানীর বর্জ্য পরিস্থিতি শামাল দিতে এই মুহূর্তে এ ছাড়া বিকল্প নেই। ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে।

পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হালকা গাড়ির লাইসেন্সধারীদের দিয়ে ভারী যানবাহন চালানো বন্ধ রেখেছে। ফলে ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকায় জমেছে বর্জ্যের স্তূপ। ওই সব এলাকার পথচারী বা জনসাধারণের নাকে রুমাল চেপে পথ চলতে হচ্ছে। পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ।

গত ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে ডিএসসিসির একটি বর্জ্যবাহী গাড়ির চাপায় মারা যান নটর ডেম কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। সেই গাড়ি চালাচ্ছিল একজন ক্লিনার। পরদিন কারওয়ান বাজারে ডিএনসিসির আরেকটি গাড়ির চাপায় পিষ্ট হন সংবাদকর্মী আহসান কবির খান। এদিনের গাড়িটি চালাচ্ছিল বহিরাগত চালক। প্রবল প্রতিক্রিয়া হলে ২৭ নভেম্বর দুই করপোরেশন নির্ধারিত চালক ছাড়া অন্যদের দিয়ে যানবাহন চালানো বন্ধ করে দেয়। দু'দিন বন্ধ রাখার পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বর্জ্যের স্তূপ জমতে শুরু করে। তখন শুরু হয় নতুন সংকট। এমন পরিস্থিতিতে গত রোববার রাতে শক্ত অবস্থান থেকে সরে এসেছে ডিএসসিসি। হালকা যানের লাইসেন্সধারী, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে কোনো অভিযোগ ওঠেনি, তাদের হাতে আবারও ভারী যানবাহন চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিএসসিসি বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এ কৌশল নেওয়া হয়েছে। তা না হলে রাজধানীবাসী দুর্গন্ধে টিকতে পারবে না। পাশাপাশি ধীরে ধীরে পরিবহন শাখাকে সমৃদ্ধ করা হবে। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন। সেই সময় পর্যন্ত এভাবেই চলতে হবে। তবে সব গাড়িচালককে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির পরিবহন শাখার শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কেউই প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। ডিএসসিসির মুখপাত্র আবু নাছের সমকালকে বলেন, যেখানে গাড়ি দুইশ, ড্রাইভার একশরও কম; সেখানে এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর পরিবহন শাখায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা বিরাজমান। এই খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সময়ের প্রয়োজন। এটা রাতারাতি সম্ভব নয়।

জানা গেছে, ডিএসসিসির ভারী যানবাহন রয়েছে ৩৩৭টি। অথচ ভারী যানবাহনের চালক আছেন মাত্র ৮৬ জন। বাকি অন্য বিভাগের যেসব কর্মীর হাতে স্টিয়ারিং দেওয়া হয়েছিল, তাদের কারোরই ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স নেই। এখন দিনের বেলার পরিবর্তে রাতে বর্জ্য অপসারণ করতে বলা হয়েছে।

ডিএনসিসির যান্ত্রিক বিভাগের অধীন বর্জ্যবাহী ভারী যানবাহন আছে ১৩৭টি। এ ছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধীন গাড়ি আছে আরও শতাধিক। বিপরীতে যান্ত্রিক বিভাগে ভারী যানবাহনের চালক আছেন মাত্র ৪১ জন। বর্জ্য বিভাগের চালকের অনুপাতও প্রায় একই রকম। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই আবার মাস্টাররোলে নিয়োজিত চালক। কিন্তু দুটি নির্মম মৃত্যুর পর ডিএনসিসি কঠোর অবস্থান নিয়ে কেবল ভারী যানবাহনের চালক দিয়েই ভারী যানবাহন চালাচ্ছে। ফলে গাড়ি কম বের হচ্ছে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নাজুক আকার ধারণ করেছে। কাঁচাবাজারসংলগ্ন এলাকাগুলো ও বিভিন্ন স্থানে বর্জ্যের স্তূপ তৈরি হয়েছে।

ডিএনসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ) আবুল হাসনাত মো. আশরাফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এখন পর্যন্ত হালকা যানের লাইসেন্সধারীদের ভারী যানবাহন চালাতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে ভারী যানবাহনের চালকদের অতিরিক্ত ট্রিপ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। এতে কিছু এলাকায় উদ্বৃত্ত বর্জ্য থেকে যাচ্ছে। এটা পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

আরও জানা গেছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শতাধিক ময়লাবাহী যানবাহনে ক্যামেরা লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসিসি।

কয়েক দিনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বর্জ্যের স্তূপ জমেছে কারওয়ান বাজার এলাকায়। এর পরই আছে কামাল সরণি (৬০ ফুট হিসেবে পরিচিত)। ওই রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে বর্জ্যের স্তূপ জমে গেছে। এ ছাড়া মিরপুর ১২, ১০ ও ১৪ নম্বর এলাকার অবস্থা নাজুক।

গতকাল সরেজমিন কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সর্বত্রই বর্জ্যের স্তূপ। যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে বর্জ্য রাস্তার মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে। পথচারী ও ক্রেতাসাধারণের চলাচলেরও উপায় নেই। নাক টিপে চলতে হচ্ছে পথচারীদের।

জানা গেছে, বর্জ্যবাহী গাড়ির চাপায় দু'জনের মৃত্যুর পর দুই সিটি করপোরেশন বৈঠকের পর বৈঠক করে চলেছে। সংস্থার শীর্ষ পর্যায় থেকে এ বিষয়ে অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গণমাধ্যমের সঙ্গে বৈঠক করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, তাদের পরিবহন শাখায় কিছু সমস্যা আছে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দুটি মিটিং করেছিলেন। তখন থেকেই ধীরে ধীরে অসংগতিগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হচ্ছে। আবার অর্গানোগ্রামে যে সংখ্যক চালকের কথা উল্লেখ আছে, তাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সেটা সংশোধনের জন্য সরকারের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।

তিনি জানান, ভারী যানবাহনের সংখ্যার তুলনায় চালকের সংখ্যা অনেক কম। ৫০ জন ভারী যানবাহন চালক নিয়োগের জন্য তিন দফায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হলে ৪১ জন আবেদন করেছিলেন। তাদের লাইসেন্সগুলো পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) কাছে পাঠালে ১৯ জনের লাইসেন্স ঠিক আছে বলে তারা রিপোর্ট দেয়। বাকিদের লাইসেন্সগুলো ছিল জাল।

তিনি বলেন, 'গত কয়েক দিনে মিটিংয়ের পর মিটিং করে চলেছি, কীভাবে দীর্ঘদিনের এই পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধান করা যায়। আমরা পরিবহন বিভাগকে একটি সুশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে আনতে চাই।'





মন্তব্য করুন