৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। এদিন মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণে যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে পালিয়ে যায় পাকিস্তান বাহিনী। যশোরই দেশের প্রথম হানাদারমুক্ত জেলা শহর। একই দিন বিকেলে টানা ছয় দিন যুদ্ধের পর শত্রুমুক্ত হয় কুড়িগ্রাম। বাঙালির বিজয়রথ যখন এগিয়ে চলেছে, সেই ক্ষণে আসে বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভুটান ও ভারত স্বীকৃতি দেয় স্বাধীন বাংলাদেশকে।

সম্মিলিত মিত্রবাহিনীর আক্রমণে ৬ ডিসেম্বর সূর্য ওঠার আগেই দেশের সীমান্তবর্তী বেশ কিছু ঘাঁটি থেকে পিছু হটতে শুরু করে পাকিস্তান বাহিনী। মিত্রবাহিনী বিমান হামলা চালায়। বঙ্গোপসাগরে ভারতের নৌবাহিনী সৃষ্টি করে নৌ-অবরোধ। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যশোরের পতন ঘটানো ছাড়া এদিন আরেক জেলা শহর সিলেটে দু'দিক থেকে আগুয়ান হয়ে গোলাবর্ষণ করে। পাকিস্তান বাহিনী পিছু হটতে চাইলেও পারেনি। স্থল ও বিমান থেকে আক্রমণে তুমুল যুদ্ধের পর অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে তারা।

ভারতের নৌবহর 'বিক্রম' থেকে হক বিমান মোংলা, খুলনা, চালনা ও পশুর নদীর মোহনা পথে আক্রমণ হানে। মোংলায় পাকিস্তানি বাহিনী তুমুল গোলাবর্ষণে বিধ্বস্ত হয়। পাকিস্তানিরাও বাণিজ্যিক জাহাজ 'অন্ধরা' থেকে বিমানবিধ্বংসী কামানের মাধ্যমে প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করে।

এই যুদ্ধের মধ্যে এদিন মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনা হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ৬ ডিসেম্বর ভারতের লোকসভায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, 'স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারের নীতিনির্ধারণী সরকারি বিবৃতি লাভের পর আগের দিনের গভীর রাত পর্যন্ত স্থায়ী ভারতীয় মন্ত্রিসভার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অবর্ণনীয় বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। শুধু ভাবাবেগে পরিচালিত হয়ে আমরা স্বীকৃতি দানের সিদ্ধান্তে উপনীত হইনি। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সর্ম্পূণরূপে বিচার করেই স্বীকৃতি দিচ্ছি।... নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রামরত বাংলাদেশের জনগণ এবং পশ্চিম পাকিস্তানি হামলা প্রতিহত করার জন্য জীবনপণ সংগ্রামরত ভারতের জনগণ আজ একই লক্ষ্যের ও একই পথের পথিক।'

কলকাতার আকাশবাণী এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় বিশেষ সংবাদ হিসেবে বাংলাদেশের স্বীকৃতির কথা প্রচার করে। দেশে-বিদেশে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন মুক্তিকামী বাঙালিরা। আর ভারতের স্বীকৃতি ঘোষণার পরপরই ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে পাকিস্তান।

এদিন স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্র থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিবৃতি প্রচারিত হয়। মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভাও এদিন ভারত সরকারকে অভিনন্দন জানায়। এই বৈঠকে ভারত সরকার ও দেশটির জনগণ এবং রাশিয়া ও পোল্যান্ডকেও কৃতজ্ঞচিত্তে তাদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়।

নথিপত্রে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের আগে বাংলাদেশকে স্বীকৃত দিয়েছিল ভুটানও। বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধোঁয়াশা থাকলেও ২০১৪ সালের ৬ ডিসেম্বর তা স্পষ্ট হয়। এদিন ভুটানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে বাংলাদেশ সফরে এলে এ নিয়ে নতুন তথ্য উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক বৈঠকে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে বাংলাদেশকে স্বীকৃতির প্রশ্নে দেশটির দালিলিক তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরেন।

এতে দেখা যায়, একাত্তরের ৬ ডিসেম্বর ভুটানের তৎকালীন রাজা জিগমে দর্জি ওয়াংচুক এক তারবার্তায় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, বিদেশি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশের জনগণের মহান এবং বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম অদূর ভবিষ্যতে সাফল্য লাভ করবে। ভুটানের জনগণ এবং তার প্রত্যাশা, সৃষ্টিকর্তা বর্তমান বিপদ থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করবেন, যাতে তিনি দেশের পুনর্গঠন এবং উন্নয়নের মহান কর্তব্যে দেশ ও দেশের মানুষকে নেতৃত্ব দিতে পারেন।'

এরপর ওই বছরের ৯ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভুটানকে প্রথম স্বীকৃতিদাতা দেশ হিসেবে ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সরকার। ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভুটান সফরে বাংলাদেশ-ভুটান যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৭১-এর ৬ ডিসেম্বর ভুটান বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছেন বলে স্মরণ করেন।

একই সময়ে রণাঙ্গনে দশম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ও সাব-সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা কর্নেল জাফর ইমামের নেতৃত্বে ফেনী মুক্ত করেন। মেজর জলিলের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা সাতক্ষীরা মুক্ত করে খুলনার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ঝিনাইগাতীর আহম্মদনগরে হানাদার বাহিনীর ঘাঁটি আক্রমণ করেন কোম্পানি কমান্ডার মো. রহমতুল্লাহ। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও মুক্ত করে সেদিন বীরগঞ্জ ও খানসামার পাকিস্তানের অবস্থানের দিকে এগিয়ে চলছিল মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী। এদিকে লাকসাম, আখাউড়া, চৌদ্দগ্রাম, হিলিতে মুক্তিবাহিনী দৃঢ় অবস্থান নেয়। রাতে আখাউড়া ও সিলেটের শমসেরনগর যৌথ বাহিনীর অধিকারে আসে। আর যৌথ বাহিনী হেঁটে ঝিনাইদহ পৌঁছে এবং শহরটি মুক্ত করে। মুক্তিবাহিনীর বীর তরুণ ও গেরিলা বাহিনী সার্বক্ষণিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যস্ত রেখে আগেই দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

এদিন দুপুরে ভারতীয় নৌবাহিনী ডকইয়ার্ড, ওয়ার্কশপ, আর্মি ব্যারাকগুলোতে বোমাবর্ষণ করে। সম্মিলিত বাহিনী এদিন যশোর, আখাউড়া, লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম, হিলিতে পাকিস্তান বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে চাপ সামলাতে না পেরে পিছু হটতে বিকল্প অবস্থান নেয় পাকিস্তান বাহিনী। তবে এর পরও রাতে আখাউড়া ও সিলেটের শমসেরনগর মিত্রবাহিনীর দখলে আসে। এদিকে কর্নেল শফিউল্লাহ, মেজর নাসিম, মেজর ভুঁইয়া, মেজর মঈন, লে. কবির মুক্তিবাহিনী ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের কয়েকশ সৈনিক নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অভিমুখে যাত্রা করেন এবং শাহবাজপুরে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে অবস্থান নেন।

এদিন ঢাকায় মিত্রবাহিনীর বিমানবহরের বোমা বর্ষণে ঢাকা বিমানবন্দরের রানওয়ে বিধ্বস্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তনের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ঢাকায় বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সময় প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ চালিয়ে যাব। পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী বর্তমান পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তান ধরে রাখতে পারবে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, তারা বাহিনী প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ করছে। এ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে ১৬টি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। ময়মনসিংহের উত্তরে কৌশলগত যুদ্ধ চলছে।

সার্বিকভাবে ৬ ডিসম্বের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য দিন।

মন্তব্য করুন