বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন- এমন সন্দেহভাজন ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠান ও ২৯ জন ব্যক্তি রয়েছেন। বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্যের নামও রয়েছে। তাদের বিষয়ে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে রোববার এ তালিকা দাখিল করা হয়। দুদকের পক্ষে আইনজীবী খুরশীদ আলম খান প্রতিবেদন দাখিল করেন। আংশিক শুনানিতে তিনি আদালতকে বলেন, দুদক দুর্নীতি ও ঘুষ-সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্তের এখতিয়ার রাখে। তবে কিছু আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে এ তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তাদের বিষয়ে তদন্তের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তালিকার অনেকেই প্রবাসী, যারা দেশ থেকে অর্থ নিয়ে গেছেন। আর এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত আন্তর্জাতিক একাধিক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান। তাই তদন্ত বিঘ্নিত হচ্ছে। এদিকে, এ বিষয়ে আজ  সোমবার ফের শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।

তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের প্রমাণ মিলেছে কিনা জানতে চাইলে খুরশীদ আলম খান সমকালকে বলেন, বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের নাম সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। হাইকোর্টে যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা দেওয়া হয়েছে, তাদের বিষয়ে তদন্ত করছে দুদক।

বিদেশি ব্যাংক, বিশেষত সুইস ব্যাংকে পাচার করা 'বিপুল পরিমাণ' অর্থ উদ্ধারের যথাযথ পদক্ষেপের নির্দেশনা চেয়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আব্দুল কাইয়ুম খান ও সুবীর নন্দী দাস। পরে ওই রিটের শুনানি নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি রুলসহ আদেশ দেন হাইকোর্ট। ওই আদেশের ধারাবাহিকতায় গতকাল হাইকোর্টে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তালিকা দাখিল করে দুদক।

দুদকের তালিকায় রয়েছেন আবদুল আউয়াল মিন্টু ও তার স্ত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়াল এবং তাদের সন্তান তাবিথ আউয়াল, তাফসির আউয়াল ও তাজওয়ার মো. আউয়াল। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজে ২০১৭ সালের নভেম্বরে 'প্যারাডাইস পেপারস' নামে এক ডাটাবেজে করের স্বর্গ বলে পরিচিত দেশগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৮ লক্ষাধিক কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য ফাঁস করে। ওই তালিকায় আবদুল আউয়াল মিন্টু ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম ছিল। সেখানে দেখানো হয়, তারা এমএফএস এনার্জি নামে একটি অফশোর কোম্পানিতে পরিচালক পদে রয়েছেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কেউ দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে পারে না।

প্যারাডাইস পেপারসের তথ্য মতে, মুসা বিন শমসের ২০১০ সালের ৪ মে ভেনাস ওভারসিজ নামে একটি কোম্পানি মাল্টায় নিবন্ধন করেন। তখন থেকে তিনি এ কোম্পানির পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার। ঠিকানা হিসেবে ঢাকার বনানীতে তার বাসার হোল্ডিং নম্বর রয়েছে।

আদালতে দাখিল করা তালিকায় আরও আছেন নিউইয়র্ক প্রবাসী মোগল ফরিদা ওয়াই, টেক্সাসের শহিদ উল্লাহ, ঢাকার বনানীর চৌধুরী ফয়সাল, বারিধারার আহমাদ সামির, ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট বাংলাদেশ, ভেনাস ওভারসিজ, ডায়নামিক এনার্জির ফজলে এলাহী, ইন্ট্রিপিড গ্রুপের কেএইচ আসাদুল ইসলাম, খালেদা শিপিং কোম্পানির জুলফিকার আহমেদ, জেমিকো ট্রেডের তাজুল সলাম তাজুল, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের মোহাম্মদ মালেক, ওসান আইস শিপিং কোম্পানির ইমরান রহমান, শামস শিপিং লিমিটেডের মোহাম্মদ এ আউয়াল, ঢাকার উত্তরার এরিক জনসন আনড্রেস উইলসন, ইন্ট্রিডিপ গ্রুপের ফারহান ইয়াকুবুর রহমান, জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের তাজুল ইসলাম, পদ্মা টেক্সটাইলের আমানুল্লাহ চাগলা, রাশিয়ার নিউটেকনোলজি ইনভেস্টমেন্টের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান, মাল্টার মোহাম্মদ রেজাউল হক, নারায়ণগঞ্জের জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মোহাম্মদ কামাল ভূঁইয়া, তুহিন-সুমন, সেলকন শিপিং কোম্পানির মাহতাবা রহমান, নারায়ণগঞ্জের জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ফারুক পালওয়ান, আয়ারল্যান্ডের গ্লোবাল এডুকেশন সিস্টেমের মাহমুদ হোসাইন এবং ঢাকা ইপিজেডের সাউদার্ন আইস শিপিং কোম্পানির শাহনাজ হুদা রাজ্জাক।

প্যারাডাইস পেপার অনুযায়ী মাল্টায় কোম্পানি থাকা ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন আমানুল্লাহ চাগলা। তার সম্পৃক্ত দেশ বাংলাদেশ ও ভারত। তার বিষয়ে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ৫ মার্চ মাল্টায় নিবন্ধিত পদ্মা টেক্সটাইলের তিনি পরিচালক ও আইনি প্রতিনিধি। মাল্টায় নিবন্ধিত হয়েছে কয়েকটি শিপিং কোম্পানি। চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এ আওয়াল ও মোহাম্মদ এ মালেকের নামে শামস শিপিং, কমর শিপিং ও মারজান শিপিংয়ের নিবন্ধন রয়েছে। মোহাম্মদ এ মালেকের বাংলাদেশি ঠিকানা চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের বেঙ্গল শিপিং লাইন। জুলফিকার আহমেদ নামে এক ব্যক্তির নিবন্ধিত কোম্পানির নাম খালেদা শিপিং, যার ঠিকানা ঢাকার ধানমন্ডির একটি হোল্ডিংয়ের। মাল্টায় নিবন্ধিত ওশান আইস শিপিংয়ের পরিচালক শাহনাজ হুদা রাজ্জাকের ঠিকানা হিসেবে ঢাকা ইপিজেডের নাম রয়েছে। ইমরান রহমান নামে অপর ব্যক্তির ঠিকানাও একই, যার নামে নিবন্ধিত কোম্পানির নাম প্রিয়াম শিপিং।

মন্তব্য করুন