বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমানকে নিয়ে অশ্রাব্য ও বর্ণবাদী মন্তব্যের পর যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানের নাম। তিনি চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহিকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছেন। তার এ-সংক্রান্ত বক্তব্য ও ফোনালাপ ছড়িয়ে পড়লে তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে শুধু মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ নয়; এমপি পদ বাতিলের পাশাপাশি শাস্তি দাবি করেছে বিভিন্ন দল, সংগঠন ও নারী অধিকারকর্মীরা।

সোমবার রাতে নিজ বাসভবনে ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, মুরাদ হাসানকে মঙ্গলবারের মধ্যে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে ওবায়দুল কাদের বলেন, মুরাদের মন্তব্য দল বা সরকারের বক্তব্য নয়।

গত ১ ডিসেম্বর তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান সম্পর্কে অশ্রাব্য মন্তব্য করার পর ক'দিন ধরে সমালোচনা চলছিল মুরাদ হাসানের। এরই মধ্যে রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফোনকলের অডিও ছড়ায়। এতে প্রতিমন্ত্রীকে চিত্রনায়ক মামনুন হাসান ইমন ও নায়িকা মাহিয়া মাহির সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়।

সমকাল ফোনকলটির ফরেনসিক পরীক্ষা করতে পারেনি। তবে ইমন সমকালকে নিশ্চিত করেছেন, ফোনকলটি বছরখানেক আগের। পবিত্র ওমরাহ পালনে বর্তমানে সৌদি আরবে থাকা মাহিও ফোনকলটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

গতকাল রাতে এক ভিডিওবার্তায় মাহি তাকে ধর্ষণের হুমকি ও কুপ্রস্তাব দেওয়া প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সেদিন বলার কোনো ভাষা ছিল না। সে জন্য আমি প্রতিবাদ করিনি। চুপ থেকেছি, পাশ কাটিয়ে গিয়েছি।

ফোনকল এবং ধর্ষণের হুমকি সম্পর্কে সোমবার সারাদিন চেষ্টা করেও মুরাদ হাসানের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি সমকাল। ধানমন্ডি ১৫ নম্বরের বাসভবনে তিনি ছিলেন না।

কুকথার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচিত প্রতিমন্ত্রী মুরাদকে জাইমা রহমান সম্পর্কে অশালীন মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইতে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি বলেছে, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে অশালীন কিছু থাকলে তা ইন্টারনেট থেকে সরানো হবে।

প্রতিমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দিন সমকালকে বলেন, মুরাদ হাসান গতকাল মন্ত্রণালয়ে আসেননি। সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় সেগুনবাগিচায় শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে তার যোগ দেওয়ার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল; সেখানেও যাননি।

তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্র সমকালকে নিশ্চিত করেছে, মুরাদ হাসান ঢাকায় নেই। সোমবার তিনি চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে তার সরকারি কিংবা কর্মসূচি নেই। পদত্যাগের চাপ এড়াতে তিনি চট্টগ্রামে 'নির্জনবাসে' চলে যান।

আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া সমকালকে বলেন, নৈতিক স্খলনের কারণে মুরাদ হাসানের সংসদ সদস্যপদও বাতিল হওয়া উচিত।

মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেছেন, মুরাদ হাসান রাজনৈতিক পরিবেশকে কলুষিত করেছেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, মন্ত্রিত্বের লোভে অমানুষ হওয়া উচিত নয়।

মাস দুই আগে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের দাবি করে আলোচনায় আসেন মুরাদ হাসান। তখন বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনগুলো তার সমালোচনা করলেও বামধারার দল, সংগঠন, নাগরিক সমাজের অনেকেই প্রতিমন্ত্রীকে সমর্থন করেন। এর পর বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাদের সম্পর্কে একের পর এক ব্যক্তিগত পর্যায়ের সমালোচনা করে আলোচনার জন্ম দেন মুরাদ হাসান।

তবে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন গত শনিবার 'নাহিদরেইন্স' নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলকে লাইভ সাক্ষাৎকার দিয়ে। সেখানে তিনি বলেন, 'আমার মুখ ভীষণ খারাপ।' বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানের রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমার সন্তানরা রাজকন্যা, যুবরাজ। ওরা রাজনীতিতে আসবে।' এর পরপর তিনি জাইমা সম্পর্কে মুদ্রণ অযোগ্য কিছু বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মহিউদ্দিন হেলাল নাহিদ প্রতিমন্ত্রীকে থামাননি; বরং তার কুকথায় সমর্থন জোগান। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই সমকালে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ধারের টাকা আত্মসাৎ এবং পাওনাদারকে হত্যার হুমকি মামলার আসামি হয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন নিজেকে পরিচালক, ইউটিউবার এবং ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে পরিচয় দেওয়া নাহিদ।

গতকাল সকালে ওই চ্যানেল থেকেই আপলোড করা ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রী মুরাদ বলেন, জাইমা রহমান ও তার মেয়ে সমবয়সী। কন্যা সমতুল্য একজন মেয়েকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার মানসিকতা তিনি পোষণ করেন না। তিনি দাবি করেন, এডিটিং করে তার কণ্ঠে জাইমা সম্পর্কে অশালীন বক্তব্য বসানো হয়েছে।

ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রী মুরাদ অভিযোগ করেন, নিজ দল আওয়ামী লীগের নেতারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তিনি দলের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, 'শ্রদ্ধাভরে তাদের বলতে চাই, আমি আপনাদের সঙ্গে নিজের যোগ্যতার তুলনা করতে চাই না। আমি আপনাদেরই ভাই। আপনাদেরই সন্তান। আপনাদেরই পরিবারের সদস্য।'

এর আগে মুরাদ হাসান বলেন, তার বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরাট বলয় কাজ করছে। পরক্ষণেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবারের সদস্যদের একহাত নিয়ে বলেন, 'এই পরিবারের সদস্যগুলোই আমার বিরুদ্ধে কথা বলে।'

ধর্ষণ হুমকির অভিযোগ ওঠার পর নারী অধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'কেউ কেউ অতিরিক্ত নারীবাদী। তাদের এমন একটা ভাব... তারা যেন আমাদের মায়েদের বোনদের নারীসমাজকে কিনে ফেলেছে। ...অনেক লেখক কবি নারীবাদীরা আমাকে নারীবিদ্বেষী আখ্যা দিচ্ছে। আমাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে।' ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, 'আমি বলতেই থাকব। তাতে আমার যাই হওয়ার হবে।'

ফোনকলের বিষয়ে চিত্রনায়ক ইমন সমকালকে বলেন, একটি চলচ্চিত্রের কাজ চলাকালে গত বছর প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান তাকে কল করেন। তথ্য প্রতিমন্ত্রী চলচ্চিত্রের অভিভাবক। তিনি ফোন করলে চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে তা ধরতে হয়। মাহিয়া মাহি প্রতিমন্ত্রীর ফোন ধরতেন না। তিনি মাহির সঙ্গে মুরাদ হাসানকে কথা বলিয়ে দিয়েছিলেন। ইমনের ভাষ্য, 'প্রতিমন্ত্রীকে তো আর না করতে পারব না।'

নায়িকাকে ধর্ষণের হুমকি প্রসঙ্গে ইমন বলেন, মুরাদ হাসান নায়িকাকে একটি পাঁচতারকা হোটেলে নিয়ে যেতে বলেছিলেন। নায়িকা ও প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ফোনে কী কথা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। সহকর্মী হিসেবে সেই রাতে তিনি প্রতিমন্ত্রীকে সামাল দিতে চেষ্টা করেছেন।

ফোনকলটিতে প্রতিমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে নায়িকাকে হোটেলে তুলে আনার হুমকি দেন। কুকর্মের প্রস্তাব দিয়ে নায়িকাকে গালাগালি করেন, হোটেলে না এলে শাস্তি দেওয়ার কথা জানান।

অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন, ডা. মুরাদ ছাত্রজীবনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। তবে সভাস্থলে সাবেক ছাত্রদল নেতারা বলেন, মুরাদ ছাত্রদলের কেউ ছিলেন না।

সেই সময়কার ময়মনসিংহ ছাত্রদলের নেতা এবং এখনকার মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল ওয়াহাব আকন্দ বলেন, মুরাদ হাসান উল্লেখ করার মতো কেউ ছিলেন না ছাত্রজীবনে।

গতরাতে প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবরে তার নির্বাচনী এলাকা জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে মিষ্টি বিলিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা।

তথ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী মুরাদ হাসান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি হন ২০০০ সালে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মতিউর রহমান তালুকদারের ছেলে মুরাদ হাসান ২০০৮ সালে জামালপুর-৪ আসন থেকে এমপি হন। ২০১৮ সালে একাদশ নির্বাচনে এমপি হয়ে তিনি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী হন। কয়েক মাস পর তাকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রী করা হয়। তখন থেকেই তার অনুযোগ ছিল, সংবাদমাধ্যম তাকে কাভারেজ দেয় না। তবে গত কয়েক মাসে একের পর বিতর্ক ও কুকথায় বারবার খবরে এসেছেন।





মন্তব্য করুন