বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের নামস্বর্বস্ব তালিকা হাইকোর্টে জমা দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ছাড়া পানামা, প্যারাডাইস পেপারসসহ অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক জোট আইসিআইজের ফাঁস করা ডাটাবেজে বাংলাদেশের শতাধিক ব্যক্তির নাম থাকলেও দুদক জমা দিয়েছে ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা। কোনো রকম যাচাই ও অনুসন্ধান ছাড়াই এ তালিকা জমা দেওয়া হয়।

এদিকে দুদকের নিজস্ব অনুসন্ধান ও তদন্তে অর্ধশতাধিক সন্দেভাজন অর্থ পাচারকারীর নাম উঠে এলেও আদালতে জমা দেওয়া তালিকায় তাদের নাম নেই। গত রোববার হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের আদালতে পানামা এবং প্যারাডাইস পেপারসে নাম এসেছে এমন ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা জমা দেয় দুদক।

চলতি বছরের শুরুর দিকে দুদক বিদেশে ফ্ল্যাট ও বাড়ির মালিক হওয়া অর্থ পাচারকারীদের তথ্য চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে হাইকোর্টের সুয়োমোটো রুল নং ২২/২০২০-এ দুদককে অন্যতম পক্ষ করা হয়। পরে হাইকোর্ট অর্থ পাচারকারীদের নাম-ঠিকানা, পরিচয় ও তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সর্বশেষ অবস্থা জানাতে দুদকের প্রতি নির্দেশ দেন। নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার দুদক ৪৩ জনের তালিকাসহ একটি প্রতিবেদন জমা দেয়।

মতামত জানতে চাইলে দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান সমকালকে বলেন, যে তালিকা হাইকোর্টে জমা দেওয়া হয়েছে, তা শেষ তালিকা নয়। দুদক অর্থ পাচারকারীদের বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। কেন দেয়নি, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে উপযুক্ত মনে করলে আরও তালিকা জমা দেওয়া হবে।

তালিকার সেেঙ্গ হাইকোর্টে জমা দেওয়া দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন দুদকের তফসিলভুক্ত আইন নয়। এ আইনের ২৮টি ধারার মধ্যে দুদক শুধু ঘুষ ও দুর্নীতি নিয়ে কাজ করছে। অর্থ পাচারের অভিযোগ তফসিলবহির্ভূত হওয়ায় এ নিয়ে অনুসন্ধান করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে তালিকাটি অভিযোগ হিসেবে আমলে নিয়ে ফাইলবন্দি করে রেখেছে। তফসিলভুক্ত না হওয়ায় নথিভুক্তও (বাতিল) করা হয়নি।

তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কারা তদন্ত করবে- এর জবাবে দুদক কমিশনার বলেন, দুদক তালিকা জমা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আদালত যখন যাদেরকে যে নির্দেশনা দেবেন, তারা সে অনুযায়ী কাজ করবেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের কিছু ধারা দুদকের তফসিলভুক্ত। মামলার ক্ষেত্রে দুদক এসব ধারা ব্যবহার করে। প্রসঙ্গত, এর আগে দুদক অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। আদালতে চার্জশিট দিয়েছে। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কিছু মামলার রায়ও হয়েছে। অনেক মামলার বিচার চলছে। মানি লন্ডারিং মামলা করে বিদেশ থেকে পাচার অর্থ ফেরত আনার রেকর্ডও রয়েছে দুদকের। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তালিকার কেউই সরকারি কর্মচারী নন। তাই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অবশ্য এর আগে দুদক বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে যাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে তারা কেউই সরকারি কর্মচারী নন। এ ক্ষেত্রে দুদকের স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

দুদকের প্রতিবেদন অনুযায়ী তালিকায় থাকা ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ দেশি-বিদেশি কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তারা তথ্য পায়নি। তালিকার জন্য হাইকোর্টের তাগিদ থাকায় কোনো রকম অনুসন্ধান ও তদন্ত ছাড়াই দায়সারা তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, দুদক অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করতে সংশ্নিষ্ট দেশগুলোতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়ে থাকে। জাতিসংঘের একটি চুক্তি অনুযায়ী এসব দেশে এই আইনিপত্র পাঠিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির অর্থ পাচার সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। পানামা, প্যারাডাইস পেপারসে প্রকাশিত বাংলাদেশের সন্দেহভাজন অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে দুদক এমএলএআর পাঠিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য সংগ্রহ করেনি। দেশীয়ভাবে যাচাইও করা হয়নি। কোনো অনুসন্ধানও করা হয়নি। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে করের স্বর্গ বলে পরিচিতি বিভিন্ন দেশে কোম্পানি খুলেছে বাংলাদেশের এমন কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম আসে। পরে ওই তালিকা বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। দুদক গণমাধ্যম থেকে সংগ্রহ করেছে এ তালিকা।

দুদকের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান সমকালকে বলেন, দুদক অনেকের নাম বাদ দিয়ে তালিকা জমা দিয়ে থাকলে দেশের যে কোনো নাগরিক আদালতে তার বক্তব্য জানাতে পারেন। তিনি আরও বলেন, যেসব সন্দেহভাজন অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলার পর তদন্ত চলছে, তাদের তালিকা আদালতে জমা দেওয়া হয়নি।

২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) চার দফায় তথ্য ফাঁস করে, যেখানে বিশ্বের কয়েক লাখ লোকের বিদেশে কোম্পানি থাকার তথ্য রয়েছে। ২০১৩ সালে অফশোর লিকসে ৩২ জনের, ২০১৬ সালে পানামা পেপারসে ৫৬ জন, ২০১৭ সালে প্যারাডাইস পেপারসে ২১ জন ও সর্বশেষ ২০১৮ সালে আবারও প্যারাডাইস পেপারসে ২২ জনের নাম প্রকাশ করা হয়। অথচ দুদক মাত্র ৪৩ জনের তালিকা পেশ করেছে। দুদক হাইকোর্টে দেওয়া প্রতিবেদনে পানামা, প্যারাডাইস পেপারসের তালিকার কথা উল্লেখ করলেও এসব তালিকায় থাকা কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে বাদ দিয়েছে।



মন্তব্য করুন