কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার পর আস্থার সংকটে পড়া ই-কমার্স খাত নিয়ে নতুন করে ভাবছে সরকার। শুরুতে এ খাতকে স্বচ্ছতায় আনতে না পারাকে ব্যর্থতা মানছেন নীতিনির্ধারকরা। পাশাপাশি কিছু উদ্যোক্তার অনিয়ম থামাতে নেওয়া পদক্ষেপেও তাড়াহুড়া ছিল বলে মনে করছেন। তাই এসব 'ভুল' ও অনিয়ম শুধরে নতুনভাবে ব্যবসা করার পথ তৈরি করতে চান তারা।

সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড় ধরনের অনিয়ম না পেলে ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুনভাবে অভিযান না চালানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলোর তদন্ত নিয়ে তাড়াহুড়া করা হবে না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সরকার চায়, শৃঙ্খলা ও নিবিড় নজরদারির আওতায় এসে আরও বিকশিত হোক ই-কমার্স। অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার জন্য যাতে কেউ ই-কমার্সকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, এটা নিশ্চিত করা হবে। এ জন্য সব প্রতিষ্ঠানকে ইউনিক বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ইউবিআইএন) নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকাসহ ১০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৩৩টি মামলা রয়েছে। এগুলো তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে 'ধীরে চলো' নীতি নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ই-কমার্সের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা গায়েব করলেও তা ফেরত পাওয়া নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো পথরেখা তৈরি হয়নি। তবে মামলা নেই, এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যে অর্থ গেটওয়েতে আটকা আছে, তা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

চলতি বছর ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হঠাৎ একের পর এক অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অনেকে গ্রেপ্তার হন। কেউ কেউ গা-ঢাকা দেন। ধারাবাহিক অভিযানের পর এ খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ই-কমার্স খাত নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়। আতঙ্কে এ খাতের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের কার্যালয় বন্ধ করে দেয়।

ই-কমার্স নিয়ে নৈরাজ্যের কারণে হাজার হাজার গ্রাহক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। এর পর এ খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে নেওয়া হয় বেশ কিছু উদ্যোগ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামানকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কমার্স সেল দুটি আলাদা কমিটি করে। এর একটি হচ্ছে কারিগরি কমিটি, যার লক্ষ্য ডিজিটাল কমার্স সংক্রান্ত কার্যক্রম, ডিজিটাল কমার্সের মাধ্যমে ব্যবসা, লেনদেনজনিত ভোক্তা বা বিক্রেতার অসন্তোষ, প্রযুক্তিগত সমস্যা নিরসন করা। আরেকটি কমিটি দেখছে, ই-কমার্স আইন ও ই-কমার্স কর্তৃপক্ষ গঠনের বাস্তবতা আছে কিনা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান সমকালকে বলেন, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৩০ জুনের পর গ্রাহকদের যে ২১৪ কোটি টাকা আটকা পড়েছে, তা কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে সেটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব টাকা পেমেন্ট গেটওয়েতে আছে। এখন যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা নেই তাদের গ্রাহকরা যাতে টাকা ফেরত পান এমন মতামত বাংলাদেশ ব্যাংককে দু'চার দিনের মধ্যে জানানো হবে। আর মামলা রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে আদালতের সিদ্ধান্তের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সফিকুজ্জামান আরও বলেন, ই-কমার্স খাত ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপারে কারও কোনো বাধা নেই। তারা স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালাতে পারে। আমরা তো এও বলছি, আপনারা এ খাতে দেশি-বিদেশি বিনেয়োগ নিয়ে আসুন। একে উৎসাহ দেব। আদালতও বলেননি- ই-কমার্স ব্যবসা চলবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা আছে তারা আইনিভাবে তা মোকাবিলা করে আবার ব্যবসা করতে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক ও ডিজিটাল কমার্স সেলের প্রধান হাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, ইউনিক বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর ছাড়া কেউ ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবে না। এ প্ল্যাটফর্ম থেকে তাদের কার্যক্রম তদারক করা হবে।

সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি ও ই-কমার্স নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির সদস্য কামরুল আহসান সমকালকে বলেন, সরকারের ডিজিটাল সাফল্যের সুযোগটা অপব্যবহার করেছে একটা চক্র। তারা প্রতারণা করে গ্রাহক ও ভোক্তার অর্থ নিজস্ব সম্পদে রূপ দেয়, কেউ পাচার করে। যারা এ কাজটা করেছে তাদের প্রতারণা ও অর্থ পাচারের অংশটুকু আমরা তদন্ত করছি। মামলা হয়েছে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে আর চলবে না- এটা বলা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় আগামীতে এ খাতে নতুন নতুন কী সংযোজন করা যেতে পারে, সে ব্যাপারে একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে। একটি কেন্দ্রীয় তদারক ব্যবস্থা থাকবে। কমন সার্ভারের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা এতে নজরের ব্যবস্থা করা হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের অনুরোধ করব, পেছনের বিষয় ভুলে এ খাতে বিনিয়োগ করুন। স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যবসা করলে সব খাত থেকে সহযোগিতা করা হবে।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বলেন, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা ই-কমার্স বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম। এটি মানুষের নিত্যদিনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা চাই না, এ খাত মুখ থুবড়ে পড়ূক।

ঢাকা নিউমার্কেটে বহুতল ভবন বিশ্বাস বিল্ডার্সে অন্তত একশ ছোট-বড় ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নিত্যডিল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সৈকত পাল বলেন, গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার কারণে অনেকেই এখন ই-কমার্সে জড়িতদের বিশ্বাস করতে চান না। ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান অনেক সংকট নিয়ে টিকে আছে। ব্যাংক ঋণও তাদের দিতে চান না কেউ কেউ।

সৈকত পাল আরও বলেন, যেভাবে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো চলছিল, তা যেন দরজা খুলে চোরকে ঘরে ঢুকতে দেওয়ার মতো ব্যাপার। তবে সেটা কেউ কেউ স্বীকার করতে চায় না। ধাক্কা খাওয়ার পর ঘুম ভাঙল সবার। বড়রা চুরি করেছে; আর ছোটরা তাদের কারণে পড়েছে ইমেজ সংকটে।

একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, ই-কমার্স নিয়ে কয়েক দফায় বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বৈঠক হয়েছে। সেখানে অধিকাংশের অভিমত, এ খাতকে অনেকে লুটপাটের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলেও সবার ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়। অনেকে ছোট পরিসরে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ই-কমার্সভিত্তিক কারবারে নিজেকে সম্পৃক্ত করে। ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঢালাও ব্যবস্থা নিলে ভবিষ্যতে কেউ এ খাতে বিনিয়োগ করবে না। আবার যুগোপযোগী পর্যাপ্ত আইন, বিধি বা নীতিমালা না থাকায় কেউ কেউ এর অপব্যবহার করে।

কয়েক উদ্যোক্তা জানান, জবাবদিহি ও সার্বক্ষণিক নজরে না রাখা এবং যুগোপযোগী নীতিমালা থাকার দায় সংশ্নিষ্টরা এড়াতে পারেন না। তাদের 'ভুলের' সুযোগ নিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান।







মন্তব্য করুন