সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে অবরুদ্ধ উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল রোববার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ২৫-৩০টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং প্রায় ৩০ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। এতে অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী, ৭ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টা অধ্যাপক জহির উদ্দিন আহমেদ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ঢিলে পুলিশের ১০ সদস্য আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের সোমবার দুপুর ১২টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল রাতে সিন্ডিকেটের জরুরি সভা শেষে উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এ কথা জানান।

আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন তানহা তাহসীন, মিত্রা সংঘ, সজল কুণ্ডু, মেহজাবিন পর্ণা, সজল কুণ্ডু, সাজেদুল ইসলাম সিজন, তাকিয়া ইসলাম, জুনায়েদ ইসলাম, সাজ্জাদ হোসেন, মসিউর ইসলাম, ইরফান, রায়হান আহমেদ, মুনির হোসেন তালুকদার, সেলিম, তমাল, সিফাত, আকাশ, জাহিদুল ইসলাম অপূর্ব, হুমায়ূন কবির অপূর্ব। আহত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল এবং জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলামও আহত হয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেছা চৌধুরী ছাত্রী হলে পানি, সিট, ইন্টারনেট, খাবারসহ বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে রিডিং রুমে আলোচনা করছিলেন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা সমস্যার কথাগুলো প্রভোস্টকে বলার জন্য হলে আসার অনুরোধ জানান। তখন প্রভোস্ট জাফরিন আহমেদ লিজা অসুস্থতার কথা জানালে ছাত্রীরা প্রভোস্ট বডির একজন সদস্যকে অল্প সময়ের জন্য হলে আসার অনুরোধ জানান। এ সময় প্রভোস্ট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। এরপর শিক্ষার্থীরা হল থেকে বের হয়ে রাত ২টা পর্যন্ত উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আন্দোলন করেন। পরে উপাচার্যের আশ্বাসে রুমে ফেরেন তারা। পরদিন শুক্রবার উপাচার্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি দল আলোচনায় বসে। কিন্তু আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় আন্দোলন চালিয়ে যান তারা। এর মধ্যে শনিবার রাতে তারা ছাত্রলীগের হামলার শিকারও হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার বিকেল ৩টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে আইআইসিটি ভবনে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। বিকেল ৪টার দিকে সেখানে বাড়তি পুলিশ অবস্থান নেয়। সাড়ে ৫টার দিকে পুলিশ শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা শুরু করে। তখন শিক্ষার্থীরা কিছুটা সরে গিয়ে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আলমগীর কবির সমকালকে বলেন, 'আমাদের শিক্ষক, ভিসি দপ্তরের কর্মকর্তাসহ অনেকেই আহত হয়েছেন, আমি সবার খোঁজখবর না নিয়ে কিছু বলতে পারছি না।'

সিলেট মহানগর পুলিশ উত্তরের উপকমিশনার আজবাহার আলী শেখের ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা পুলিশের ওপর উত্তেজিত হয়। এরপর পুলিশ লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

অধ্যাপক জহিরের বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশের গুলিতে তিনি আহত হননি। ওই গুলি কারা ছুড়েছে, তা তিনি জানেন না। অধ্যাপককে মাউন্ড এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এক নারী পুলিশ সদস্যও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

পৌনে ৬টার দিকে তালা ভেঙে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে তার বাসভবনে পৌঁছে দেয় পুলিশ। এ ঘটনার পরে ক্যাম্পাসে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পুলিশের উপকমিশনার আব্দুল ওহাব সমকালকে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এর আগে সকালে শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে সিরাজুন্নেছা চৌধুরী ছাত্রী হলের প্রভোস্ট কমিটির পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি আদায় এবং ছাত্রীদের চলমান আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগে রাস্তা অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। দুপুর পৌনে ৩টার দিকে গোল চত্বরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আলমগীর কবির, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. তুলসী কুমার দাস ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মহিবুল আলমসহ কয়েকজন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিক্ষক সমিতির সভাপতি আশ্বাস দিয়ে বলেন, হলের গুণগত মানোন্নয়ন এবং অব্যবস্থাপনা সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে সাত দিন সময় চান। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাদের কোনো দাবি না মানায় বর্ধিত সময় দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপর শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের পেছন পেছন রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে গেলে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনকে সামনে পান। তখন শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। উপাচার্যকে নিয়ে উপস্থিত শিক্ষক ও কর্মকর্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া আইআইসিটি ভবনে ঢুকলে শিক্ষার্থীরা সেখানে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন।

অনির্দিষ্টকাল বন্ধ :উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলেও প্রশাসনিক সব কার্যক্রম চলবে। তিনি বলেন, যার পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছিলেন সেই প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদ লিজা পদত্যাগ করেছেন। তার পরিবর্তে বেগম সিরাজুন্নেসা হলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাজিয়া চৌধুরীকে।

উপাচার্যের এই ঘোষণার পর আবার বিক্ষোভ শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা হল ছাড়বেন না ঘোষণা দিয়ে মিছিল করেছেন।

মন্তব্য করুন