সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে নজরদারি করতে চান জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)। এ জন্য তারা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সঙ্গে যুক্ত হতে চান। আইএমইডির জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে কোনো অফিস না থাকায় সিলেটের ডিসি এ প্রস্তাব দিয়েছেন। এ জন্য ডিসি কার্যালয়ে প্রকল্প গ্রহণ/বাস্তবায়নে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা গঠনের প্রস্তাব করেছেন ভোলার ডিসি।

পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে পুলিশের প্রতিবেদনের পাশাপাশি মতামত দিতে চান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। এ ছাড়া ডিসি সম্মেলনের মতো বিভাগীয় পর্যায়ে ইউএনও সম্মেলনের প্রস্তাবও এসেছে। আগামীকাল মঙ্গলবার শুরু হতে যাওয়া ডিসি সম্মেলনে এসব প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।

জুডিশিয়াল সার্ভিস আলাদা হওয়ার পর থেকে প্রতি বছরই ডিসি সম্মেলনের আগে ফৌজদারি অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা চেয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দাবি জানিয়ে আসছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এ ছাড়া মোবাইল কোর্টের কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর কয়েকটি ধারা মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর তফশিলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়ে আসছেন। কিন্তু কোনোবারই সরকারের পক্ষ থেকে এ ইস্যুতে সাড়া মেলেনি। এবারও দেওয়া হয়েছে একই প্রস্তাব।

এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার জন্য ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমাতে সব জেলায় আইসিইউ-সিসিইউ স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন ডিসিরা। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকায় নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মান উন্নীত হয়েছে। তাই সব দপ্তরের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লা সিটিকে ব্যয়বহুল শহর হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব এসেছে।

জনপ্রশাসন সচিব কে এম আলী আজম বলেন, আইএমইডি থেকে জেলা প্রশাসকদের মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের ক্ষমতা অর্পণ করা হলে, ডিসি কার্যালয়ে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা গঠন করা হবে।

তিন দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করবেন। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব স্বাগত বক্তব্য দেবেন। মাঠ প্রশাসনের উদ্ভাবন, সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হবে। পরে ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনাররা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চুয়ালি মুক্ত আলোচনায় অংশ নেবেন। সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠ পর্যায়ের নানা প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা তারা অনলাইনে প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরবেন। সম্মেলনে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্য অধিবেশন হবে। এসব অধিবেশনে মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের কর্মকর্তারা সরাসরি উপস্থিত থাকবেন। করোনার কারণে এবার রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির সেশনটিও হবে ভার্চুয়ালি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ডিসি জানান, প্রতি বছর ঘটা করে ডিসি সম্মেলন করা হলেও এর সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন আটকে থাকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। বাস্তবায়নাধীন, চলমান অথবা বাস্তবায়ন হয়নি- এসব শব্দের আবরণে চাপা পড়ে ডিসি সম্মেলনে গৃহীত উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত। ফলে অন্যান্য বছরের প্রস্তাবগুলো ঘুরেফিরে আবার এসেছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, কাগজে-কলমে প্রায় প্রতি বছরই ডিসি সম্মেলনে গৃহীত ৯০ শতাংশের বেশি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ চিত্র ৬০ শতাংশেরও নিচে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা।

একজন ডিসি বলেন, ডিসিরা মাঠ প্রশাসনে কাজ করতে গিয়ে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হন, সমাধানের জন্য তা সম্মেলনে তুলে ধরেন। এসব সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। কিন্তু যেসব সমস্যার সঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রশাসন জড়িত, সেগুলোর বেশিরভাগই আটকে থাকে। ডিসিরা উদ্যম নিয়ে সম্মেলনে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন। জেলার সার্বিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হয় না বলে জানা গেছে।

ডিসি-বিভাগীয় কমিশনারদের ২৬৩ সুপারিশ: জেলা পর্যায়ের সব কর্মচারীর বেতন ইএফটির মাধ্যমে প্রদান, পার্বত্য জেলাগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাহাড়ি ভাতা মূল বেতনের ৩০ শতাংশ কার্যকর, চাকরিরত অবস্থায় সরকারি কর্মচারী মৃত্যুবরণ করলে তাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ভাতা চালু, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পুল তৈরিকরণ, ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়াবলি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তকরণ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন পদ সৃষ্টি, প্রত্যেক ইউনিয়নে শূন্যপদে একজন করে ইউনিয়ন সমাজকর্মী নিয়োগ, জেলা পর্যায়ে আবাসিক সুবিধাসহ প্রতিবন্ধীদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন, ল্যাকটেটিং মাদার প্রোগ্রামের পরিধি বৃদ্ধি, সব বিভাগীয় শহরে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল নির্মাণ, জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ, বেকার যুবকদের স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে পর্যটন ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন, হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন, মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের মাধ্যমে ধানের মূল্য পরিশোধ, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে বিদেশ গমনেচ্ছুদের ফিঙ্গার প্রিন্ট চালু, শ্রমিকদের ডেটাবেজ তৈরি, শিল্পনীতি হালনাগাদকরণ, জনপ্রশাসনের পদায়ন নীতিমালা পরিবর্তন, ডিসি কার্যালয় ও সার্কিট হাউসে নিরাপত্তায় আনসার নিয়োগ, ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সম্মানি বৃদ্ধি, উপজেলা পরিষদের কর্মচারীদের বদলির ক্ষমতা ডিসি এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনারের হাতে ন্যস্ত করা, ৬৪ জেলায় জাতীয় পরিচয়পত্র প্রণয়নের মডেলে ক্রাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে জাতীয় জিআইএসের মাধ্যমে জরিপকার্য পরিচালনা করে এনআইডি নম্বরকে একটি খতিয়ান নম্বর হিসেবে ডিজিটাল ম্যাপসহ প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ, সরকারি খাস জমি সংরক্ষণের জন্য অর্থনৈতিক খাত সৃষ্টি, মোবাইল কোর্টের আপিল মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি নিয়োগের ব্যবস্থা করা, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস চালু, সিএনজি ইজিবাইক ও অন্যান্য যান উৎপাদন, বিক্রয় ও মজুতের সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন, ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি ও যাত্রী হয়রানি বন্ধে অনলাইন ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে সম্পন্ন করা, সব জেলায় অফিসার্স ডরমিটরি নির্মাণসহ ৬৪ জেলার ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনাররা ২৬৩টি প্রস্তাব করেছেন।

এবারের সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি প্রস্তাব ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত (১৮টি), সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (১৬টি) ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের (১৪টি)।

মন্তব্য করুন