স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের দ্বন্দ্বের খবর মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে। আইন না মেনে ত্রাণ কমিটিসহ প্রায় সব কমিটির সভাপতি ডিসি-ইউএনওরা। সম্প্রতি জনসম্পর্কিত বেশির ভাগ কমিটির প্রধান করা হয়েছে আমলাদের। এসব নিয়ে সংসদেও সমালোচনা করেছেন এমপি-মন্ত্রীরা। অবশেষে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ডিসিদের আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন মন্ত্রীরা।

তিন দিনের ডিসি সম্মেলনের শেষ দিন গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা 'সম্মান করেন না' অভিযোগের ব্যাপারে জেলা প্রশাসকদের আরও 'সচেতন' হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এ ছাড়া ডিসিদের ২৬৩ প্রস্তাবের মধ্যে ক্ষমতা বাড়ানো-সংক্রান্ত বেশির ভাগ প্রস্তাবই অনুমোদন দেওয়া হয়নি। নিজ কাজের প্রতি কঠোরভাবে দায়িত্বশীল হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্মেলনের প্রথম দিন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ডিসিরা প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা পর্যায়ে কমিটি করার পরামর্শ দিলেও তাতে সম্মতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, আমিও ডিসি ছিলাম। আমি মনে করি, এটা প্রয়োজন নেই। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, যেসব জায়গায় ইউএনও এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের মধ্যে সমস্যা হয়, সেগুলো সমাধান করতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে ৫৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং একটি কার্যালয়ের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী, সচিব ও দপ্তরপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, তাদের স্থানীয় প্রশাসন বা অন্য সরকারি অফিস সে ধরনের সম্মান দেয় না। তারা যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, কিছু কমিটমেন্ট আছে, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয় না। এসব বিষয় নিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ হয় না, এটা দুঃখজনক। জনপ্রতিনিধিদের এই অভিযোগের বিষয়ে আরও সচেতন হতে জেলা প্রশাসকদের বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসীদের পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রেও ভোগান্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে অন্যান্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীও ডিসিদের নানা নির্দেশনা দিয়েছেন।

দুর্নীতি দমনে জেলা প্রশাসকদের সহযোগিতা চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেছেন, একজন ডিসি জানেন, তার অফিসে কোথায় কোথায় দুর্নীতির সুযোগ আছে। এ জন্য আমরা ডিসিদের অনুরোধ জানিয়েছি, তারা যেন সব সময় সাহায্য করেন।

অপপ্রচার বন্ধে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান :তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার বন্ধে আরও তৎপর হতে ডিসিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। দেশে সাড়ে ৮ থেকে ৯ কোটির কাছাকাছি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রচারের একটি বড় ক্ষেত্র, অপপ্রচার ছড়ানোরও বড় ক্ষেত্র এটি। আমরা যদি গত সাত-আট বছরের পরিসংখ্যানে দেখি, আমাদের দেশে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যেসব গুজব রটানো হয়েছে, অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে, স্থানীয়ভাবে বিশৃঙ্খলা থেকে সারাদেশে বিশৃঙ্খলা তৈরির অপচেষ্টা হয়েছে, প্রায় সবই এই মাধ্যমে করা হয়েছে।

জুয়ার সাজা বাড়বে :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, জুয়া খেলার অপরাধে সাজা বাড়াতে ডিসিরা যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাতে সম্মতি দেওয়া হয়েছে। দেড়শ বছরেরও বেশি পুরোনো আইনটি 'যুগোপযোগী করার' ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জুয়া আইনের শাস্তি বাড়ানো যায় কিনা, জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে সেই পরামর্শটি এসেছে। এই আইনটি ব্রিটিশ আমলের আইন। এই আইনটি কোথা থেকে কীভাবে হয়েছিল, সেটা আমরা এখন খুঁজে বের করেছি।

স্বাস্থ্যবিধি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ :স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যবিধি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছি। পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের সহায়তাও চাওয়া হয়েছে। দেশে করোনা সংক্রমণ যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে সরকার আতঙ্কিত না হলেও বিষয়টি আশঙ্কাজনক। জেলা প্রশাসকদের বলেছি, আপনারা গতবার যেভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করেছেন, এবারও সেটা করতে হবে।

থাকছে না পাওয়ার অব অ্যাটর্নি :জমিজমার ক্ষেত্রে আইনি ক্ষমতা বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির অপব্যবহার হচ্ছে জানিয়ে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে কিন্তু অনেক সমস্যা হচ্ছে। এই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি অপব্যবহার করা হচ্ছে, এতে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আমি সোজাসাপটা বলে দিয়েছি, যারা প্রবাসে থাকেন, তারা দূতাবাসের মাধ্যমে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি পাবেন। তবে যারা দেশে ফিরে এসেছেন তাদের আর পাওয়ার অব অ্যাটর্নি থাকছে না। এটা বন্ধ করে দেব।

মসজিদে স্বাস্থ্যবিধি মানার আহ্বান :ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান বলেন, করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতির মধ্যে মসজিদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নামাজ আদায়ের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ডিসিদের। এ ছাড়া ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা, মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ কাজের তদারকি ও সংশ্নিষ্ট কাজের ভূমির জটিলতা নিরসনে বিশেষভাবে সচেষ্ট হওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

ডিসিদের শুদ্ধাচার বিষয়ক কর্মশালা আজ :তিন দিনের ডিসি সম্মেলন শেষে আজ শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৬৪ জেলার ডিসি ও আট বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে জাতীয় শুদ্ধাচার কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে এ কর্মশালা। এ সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।

সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতিমুক্ত করতে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন করেছে সরকার। জাতীয় শুদ্ধাচার পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য সরকারি সব অফিসের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে।





মন্তব্য করুন