দুর্নীতির কারণে যে পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছিল, ক্ষমতা থেকে মাহাথির মুহাম্মদের বিদায়ের পর সেই প্রথার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে চায় মালয়েশিয়া। আগেরবার ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগে অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছিল। এবার ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিতে চায় মালয়েশিয়া।

আগেরবারের তিক্ত অভিজ্ঞতায় সিন্ডিকেটে রাজি ছিল না বাংলাদেশ। তবে প্রায় সাড়ে তিন বছর বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে ঘুরেফিরে সিন্ডিকেটের পথেই হেঁটেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এম সারভানের চিঠি এবং তার জবাবে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদের লেখা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে গত ১৯ ডিসেম্বর সমঝোতা স্মারকে সই (এমওইউ) করে মালয়েশিয়া। এমওইউ সইয়ের পর জানানো হয়েছিল, জানুয়ারি থেকেই কর্মী নিয়োগ শুরু হবে। তবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী নিতে চায়। সে কারণেই দেরি হচ্ছে।

গত ১৪ জানুয়ারি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইমরান আহমদকে চিঠি পাঠিয়েছেন এমওইউতে সই করা মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এম সারভান। এতে বলা হয়েছে, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫টি প্রধান রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করতে চায় মালয়েশিয়া। এসব প্রতিটি রিক্রুটিং এজেন্সির আওতায় আরও ১০টি এজেন্সি সাব এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে কাজ করবে সব মিলিয়ে ২৫০টি এজেন্সি।

মালয়েশিয়ার চিঠির জবাব দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ। এতে তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংশ্নিষ্ট ধারা এবং বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আইন-২০১২ অনুযায়ী সরকার কিছু নির্দিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিতে পারে না। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বৈধ লাইসেন্সধারী সব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য কর্মী পাঠানোর সুযোগ উন্মুক্ত রাখতে হবে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার সব বৈধ এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়াকে দেবে। মালয়েশিয়া সরকার অনলাইনে সেখান থেকে এজেন্সি বাছাই করতে পারবে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ সিন্ডিকেট চায়নি। কিন্তু মালয়েশিয়াকে এজেন্সি বাছাইয়ের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে সিন্ডিকেটই হতে যাচ্ছে।

প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর চিঠিতে তিনবার বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে বাংলাদেশ স্বচ্ছতা, অনিয়মযুক্ত এবং নিরাপদ অভিবাসন চায়। কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠক ডাকার পরামর্শ দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী।

ইমরান আহমদ সমকালকে জানান, ১৭ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার মন্ত্রীর চিঠি পেয়েছেন। ইতোমধ্যে এর জবাবও দিয়েছেন। রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়াকে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে তারা এজেন্সি বাছাই করবে। তবে পুরো ঠিক করতে জেডব্লিউজি বৈঠকের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আবারও বলেন, বাংলাদেশ সিন্ডিকেট চায় না। মালয়েশিয়াকে এজেন্সি বাছাইয়ের সুযোগ দিলে আগের মতোই সিন্ডিকেট হবে কিনা- এ প্রশ্নে মন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ কোনো এজেন্সির তালিকা বাছাই করেনি। যতজন বৈধ লাইসেন্সধারী এজেন্সি রয়েছে, সবার তালিকাই পাঠানো হয়েছে।

তবে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মালিকদের সূত্রে জানা যায়, মালয়েশিয়াকে রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে আসলে সিন্ডিকেট করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সাড়ে তিন বছর ধরে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার বন্ধ। করোনার কারণে সৌদি আরব ও ওমান ছাড়া অন্যান্য দেশ খুব বেশি সংখ্যায় কর্মী নিচ্ছে না। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশ দর কষাকষির সুযোগও পাচ্ছে না।

বাংলাদেশ থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ করে মালয়েশিয়ার মন্ত্রী, আমলাদের লাভবান হওয়ার অভিযোগ বহু পুরোনো। ২০০৯ সালে নানা অভিযোগ তুলে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে মালয়েশিয়া। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৫ সালে সমঝোতা স্মারক সই করে। বহুল আলোচিত জিটুজি প্লাস নামে পরিচিতি এ সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে প্রথমে ৩৭ হাজার এবং পরে এক লাখ ৬০ হাজার টাকার পর্যন্ত খরচ নির্ধারণ করা হয়। মালয়েশিয়ার পছন্দের ১০ এজেন্সি পৌনে তিন লাখ কর্মী পাঠায় আড়াই বছরে। তবে একজন কর্মীও নির্ধারিত ব্যয়ে মালয়েশিয়া গিয়েছেন, এমন নজির নেই। কর্মীপ্রতি তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এই বাড়তি টাকা দুই দেশের সিন্ডিকেটের পকেটে গেছে। কর্মীরা সেখানে গিয়ে কাজ পাননি, প্রতারিত হয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়কার মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আহমেদ জাহিদ হামিদির ভাই ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল। ২০১৮ সালে ক্ষমতায় ফিরে মাহাথির মুহাম্মদ সরকার দুর্নীতির অভিযোগে জিটুজি প্লাসে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে। মাহাথির সরকারের অভিযোগ ছিল, ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে কর্মী নিয়োগে অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি হয়েছে।

মাহাথির সরকারের বিদায়ের পর মালয়েশিয়ায় ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও) আবার ক্ষমতায় ফিরেছে। আহমেদ জাহিদ হামিদি এই জোটের প্রধান। রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সূত্র জানিয়েছে, ২০১৫ সালে যারা সিন্ডিকেট করেছিল, তারাই এখন মালয়েশিয়ায় ক্ষমতায়। তারাই সিন্ডিকেট করছে। বাংলাদেশের যে ১০ এজেন্সি সিন্ডিকেট করেছিল, এবার তাদের ৯টি রয়েছে।

রিক্রুটিং এজেন্সির ঐক্য পরিষদের সভাপতি টিপু সুলতান সমকালকে বলেন, আগে যারা ছিল তাদের দল ভারী করতে এবার সঙ্গে আরও ১৫টি যোগ করেছে। আগের সিন্ডিকেটে থাকা প্রতিটি এজেন্সির অধীনে ২০টি এজেন্সি কর্মী পাঠানোর কাজ করছিল। এবার ১০টি এজেন্সিকে সাব এজেন্ট করার প্রস্তাব নতুন কিছু নয়। ঠিক আগের মতোই সিন্ডিকেট হতে যাচ্ছে। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে আগামী সোমবার সংবাদ সম্মেলন করা হবে। সেখান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।



মন্তব্য করুন