উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) আমরণ অনশনকারী শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কনকনে ঠান্ডায় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে কয়েকজনের। অনেকের শরীরে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ছয়জনকে নেওয়া হয়েছে হাসপাতালে। ধারাবাহিক আন্দোলনে করোনা-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি ও নির্দেশনা ঢিমেতালে অনুসরণ করায় সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে শিক্ষার্থীদের।

শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিকে কেন্দ্রে রেখে অচলাবস্থা নিরসনের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষক ও রাজনীতিকদের পক্ষ থেকে যারা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে আসছেন, তারা সবাই বলছেন, আলোচনার মাধ্যমে 'সমস্যা সমাধানের' কথা। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অনশনরত শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়লেও এবং করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা থাকলেও উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আশা করছে, সরকার 'সমস্যা সমাধানে' উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে।

এদিকে পুলিশি অ্যাকশনের ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, সে ব্যাপারেও বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গঠনের পাঁচ দিন পরও তদন্ত কমিটির প্রধান ফিজিক্যাল সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রাশেদ তালুকদার লিখিত কোনো চিঠি বা নির্দেশনা পাননি। সমকালকে তিনি বলেন, 'বিষয়টি শোনার পর্যায়ে রয়েছে। উপাচার্য বলেছেন, তবে লিখিত কিছু পাইনি। তাই কিছু বলতেও পারছি না।' এসব কারণেও শিক্ষার্থীদের অবস্থান ক্রমেই অনড় হয়ে উঠছে।

গত বুধবার বেলা ৩টার দিকে আমরণ অনশন শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে এক শিক্ষার্থীর বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি বাসায় ফিরে গেছেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সহমর্মিতা জানিয়েছে সিলেট বিএনপি। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের দাবিকে সমর্থনের পাশাপাশি জানিয়েছে, অনশনকারীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত।

শিক্ষকদের অবস্থান :গতকাল শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল একাধিকবার আলোচনার চেষ্টা করলেও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করলেই শুধু আলোচনা সম্ভব। শিক্ষকদের এই প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ড. আনোয়ারুল ইসলাম। আলোচনার চেষ্টাকালে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, 'সাস্টে কেন রক্ত? আর যেন রক্ত না ঝরে। রক্ত যারা ঝরিয়েছে, তাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে আসছি। একটি সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে আসছি।'

এ সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মোহাইমিনুল বাশার বলেন, 'আপনাদের সঙ্গে আমাদের আবারও দেখা হবে। আমরা সবাই একটা সুন্দর ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে চাই। কিন্তু কথায় কথায় গুলি চালানোর হুকুম দেবেন, এমন উপাচার্যের কাছে আমরা নিজেদের নিরাপদ মনে করছি না।' এই শিক্ষার্থী বলেন, 'আপনারা সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন; কিন্তু এখনও আমাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছেন না। কিন্তু এখন আমাদের প্রয়োজন সংহতির।'

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক আদর্শগত বিবেচনায় শিক্ষকদের তিনটি আলাদা গ্রুপ রয়েছে। কিন্তু এসব গ্রুপের নেতৃস্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতপন্থি কয়েকজন শিক্ষক উপাচার্যকে সম্মিলিতভাবে সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ কারণে কটাক্ষ করে 'জাতীয় সরকারের প্রধান'ও বলছেন। এদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন, উপাচার্য যে বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়েছেন, তাতে পদত্যাগের বিকল্প আছে বলে মনে হয় না।

শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলন :গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ১১টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, ওই দিনই সকাল ১১টার দিকে গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে উপাচার্য শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন নাফিসা আনজুম ইমু ও আশিক হোসেন।

সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সবাই দেখেছেন, কীভাবে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। অথচ উপাচার্য বলছেন, আমরা নাকি প্রথমে হামলা চালাই। আমরা এই মিথ্যাচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

তারা আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনোদিন উপাচার্যের নির্দেশ ছাড়া পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে পারে না। সে দিনের ঘটনার পর আমরা শিক্ষার্থীদের কেউ এই উপাচার্যের কাছে নিরাপদ নই। তিনি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা অনশন চালিয়ে যাব।

পুলিশের উল্লেখিত অ্যাকশন প্রসঙ্গে মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ সমকালকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সেদিন উপাচার্যের অনুরোধে পুলিশ সেখানে গিয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছিল। সেদিনের ঘটনার পর গণমাধ্যমে তার বক্তব্যেই বিষয়টি পরিস্কার।

গতকালও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম দাবি করেন, পুলিশি অ্যাকশনের নির্দেশদাতা কে, তা স্পষ্ট নয়। তদন্তের মাধ্যমে তা পরিস্কার হলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।

সরকারি ও দলীয় প্রচেষ্টা :এরই মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির নির্দেশে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেছে। এ প্রসঙ্গে গতকাল শফিউল আলম চৌধুরী বলেন, দু'পক্ষের মধ্যকার অচলাবস্থা নিরসনের জন্য গিয়েছিলাম। বলেছি, তাদের সঙ্গেই আছি। যে মামলা হয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীদের যেন হয়রানি করা না হয়- দায়িত্ব নিয়েই সে নিশ্চয়তা দিয়েছি। ভবিষ্যতেও যেন তাদের বিরুদ্ধে একাডেমিক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্রুত সমস্যা সমাধানের কথা বলেছেন। যেভাবে হোক তা করতে হবে।

এদিকে, গতকাল বিকেলে সিলেট নগরীর পাঠানটুলায় একটি মাদ্রাসার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, এ বয়সে শিক্ষার্থীদের একটু উত্তেজনা থাকতেই পারে। একটু সময় দিয়ে বুঝিয়ে, তাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবির ব্যাপারে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

বিএনপির সহমর্মিতা প্রকাশ :গতকাল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করে সহমর্মিতা প্রকাশ করেন সিলেট জেলা ও নগর বিএনপির নেতারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নগর বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকি, সদস্য সচিব মিফতাহ সিদ্দিকী, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সিলেট সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী প্রমুখ।







মন্তব্য করুন