লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সবচেয়ে পিছিয়ে যোগাযোগ খাত

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪

জাফর আহমেদ

চলমান ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় খাতভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে যোগাযোগ অবকাঠামো খাত। বিশেষ করে সড়ক, সেতু, রেল ও বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে এ খাত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি। প্রতি বছরের বাজেটে এ খাতটি যথেষ্ট বরাদ্দ পাওয়া সত্ত্বেও এ খাতে অতিরিক্ত প্রকল্প গ্রহণ করে উন্নয়নকে ব্যাহত করা হয়েছে। এমতাবস্থায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চিহ্নিত করে সেগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্যবর্তী মূল্যায়নে সরকারকে এ পরামর্শ দেওয়া হয়। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ২০১১ সাল থেকে চলমান ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন বছরের মধ্যবর্তী মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ওই প্রতিবেদনে অতিরিক্ত প্রকল্প গ্রহণকেই খাতটি পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, বর্তমানে শুধু সড়ক ও জনপথ বিভাগ ছোট-বড় ১৫৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এত বেশি সংখ্যক প্রকল্প হওয়ায় সব প্রকল্পই প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দ পাচ্ছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করে জিইডি।
জানা গেছে, জিইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রধান সাতটি লক্ষ্যের মধ্যে বেশিরভাগ লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন মতে, এ খাতটি পিছিয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, সরকারি-বেসরকারি অংশগ্রহণের (পিপিপি) মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতা। জিইডি মনে করে, পিপিপির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে না পারা এবং টেন্ডারিং প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে পিপিপির মাধ্যমে আশানুরূপ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পিপিপিকে সহজিকরণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় ওই প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটি শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
জানতে চাইলে জিইডির সদস্য ড. শামসুল আলম সমকালকে জানান, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্যবর্তী মূল্যায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রধান খাতগুলোতে যেসব লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে তা অর্জিত হচ্ছে কি-না তা খতিয়ে দেখা। একইসঙ্গে চলমান পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে যেসব সমস্যা দেখা দিচ্ছে তা মাথায় রেখে পরবর্তী পরিকল্পনা গ্রহণ করলে তা আরও বাস্তব কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক হবে বলে মনে
করেন তিনি।
প্রতিবেদন মতে, ৫ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ২০১০ থেকে ২০১৩ মেয়াদে প্রথম তিন বছরে গড়ে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে; কিন্তু এ অর্জন ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কম। এর মূল কারণ হিসেবে বিগত রাজনৈতিক সহিংসতা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে। জানুয়ারিতে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং এ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। চলতি অর্থবছরের অর্জন দিয়ে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বিনিয়োগ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। অন্যদিকে দারিদ্র্য বিমোচনে এসেছে বড় সাফল্য। ২০১৫ সাল নাগাদ দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার সাড়ে ২২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সম্প্রতি হালনাগাদ প্রতিবেদনে চলতি বছরেই এ হার ২৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০ সালের জরিপ অনুযায়ী এ হার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল।
আলোচিত সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ, বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্যের সূচকগুলো ভালো অবস্থানে থাকলেও মূল্যস্ফীতির হার লক্ষ্যমাত্রায় বেঁধে রাখা যায়নি। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক প্রতিবেদনে লক্ষ্য ৬ শতাংশ থাকলেও মূল্যস্ফীতি এখনও ৭ শতাংশের উপরে রয়েছে। নানা সমস্যার পরও তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর ভর করে তিন বছরে সার্বিক রফতানি বেড়েছে ৭৭ থেকে ৭৯ শতাংশ। তবে রফতানি পণ্য আটকে আছে তৈরি পোশাক শিল্পকে ঘিরেই। সর্বোপরি রফতানিতে বহুমুখীকরণের অভাবকে বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ খাতগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধিকে বড় অর্জন উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০ সালকে ভিত্তি ধরে ২০১৩ সালের মধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে পিছিয়ে রয়েছে অবকাঠামো উন্নয়নে। সরকারের বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হলেও বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।