খেলাপি ঋণ কমাতে দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা আবারও ঘোষণা করলেন নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যাংকের মালিকদের সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক শেষে বলেছেন, আজ থেকে খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না। বিদ্যমান খেলাপিও ধীরে ধীরে কমে আসবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে নিজ কার্যালয়ে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, বিএবি নিশ্চয়তা দিয়েছে খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। কীভাবে কমানো যায় পরে বৈঠক করে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বৈঠকে বিএবি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ায়ম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান ডা. এইচবিএম ইকবাল, এক্সিম ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মহাসচিব নূরুল ফজল বুলবুল, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল হাসানসহ বিভিন্ন ব্যাংকের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, খেলাপি ঋণ নিয়ে সবার উৎকণ্ঠা রয়েছে। তার নিজের উৎকণ্ঠা থাকলেও তা কম। কারণ যেভাবে সংবাদপত্রে খেলাপি ঋণ নিয়ে লেখা হয়, সে পরিমাণে খেলাপি ঋণ নেই। এটি এখনও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, মোট ঋণের ১১ থেকে ১২ শতাংশ খেলাপি। অনেক দেশের তুলনায় তা খুব বেশি নয়।

বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, কোন ব্যাংকের কী পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে বিএবি সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেবে। সেখানে কার কাছে কত টাকা পাওয়া যাবে, মূল ঋণ কত এবং সুদসহ কত পাওয়া যাবে এসব তথ্য থাকবে। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও কাজ করছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, বিএবির কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তথ্য মিলিয়ে দেখার পর কোথা থেকে কার্যক্রম শুরু করা হবে তা ঠিক করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, মোট ঋণের যা ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী খেলাপিদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, যারা ব্যবসা করেন তারা সবাই প্রভাবশালী। ব্যবসায়ীরা যদি প্রভাবশালী না হন তাহলে দেশ এগোবে কীভাবে। দেশে বিনিয়োগ কীভাবে হবে। কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, সেবা কীভাবে দেবে। ব্যবসায়ীরা অর্থনীতিতে ৮২ শতাংশ অবদান রাখছেন। ৮২ শতাংশকে বাদ দিয়ে ১৮ শতাংশ নিয়ে অর্থনীতিকে কীভাবে সাজানো সম্ভব প্রশ্ন রেখে তিনি প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে তালিকা দেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

এক অঙ্কে সুদহারের সিদ্ধান্ত কবে কার্যকর হবে জানতে চাইলে মুস্তফা কামাল বলেন, সবার আগে খেলাপি ঋণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যখন খেলাপি ঋণ থাকবে না, সুদহার এমনিতেই কমে যাবে। খেলাপি ঋণ বেশি হলে স্প্রেড বাড়ে এবং এতে সুদহার বাড়ে। একটার সঙ্গে আরেকটি সম্পৃক্ত। ফলে সুদহার নিয়ে এ বৈঠকে আলোচনা হয়নি।

বিএবির চেয়ারম্যান বলেন, খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন। এ বিষয়ে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। সরকারের সহযোগিতা, বিএবির নিজস্ব শক্তি ও প্রজ্ঞা এবং এমডিদের কর্মক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রীকে কথা দেওয়া হয়েছে এখন থেকে খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। তিনি আরও বলেন, অনেক খেলাপি আছেন যারা টাকা নিয়ে চলে গেছেন। এটা এক ধরনের রোগ। আবার অনেকে আছেন যারা ১০ বছর ধরে ব্যবসা করছেন; কিন্তু হঠাৎ খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন। হয়তো মারা গেছেন বা শিল্প-কারখানায় আগুন লেগেছে। এ কারণে খেলাপি হয়েছেন। এসব বিষয় চিহ্নিত করতে বিএবি নিজেরা বসবে। তারপর অর্থমন্ত্রীকে পরিস্থিতি তুলে ধরা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, ঋণখেলাপিদের আগে সংশোধন করার চেষ্টা করা হবে। ইচ্ছাকৃত কিংবা প্রাকৃতিক কারণে কেউ দিতে পারছেন কি-না তা চিহ্নিত করা হবে। এর পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টাকা নিয়ে কেউ চলে গেছে এবং এতে যদি কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত থাকেন তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ক্ষমা হবে না। অন্যদিকে ভালো ব্যবসায়ীদের কিছু ছাড় দেওয়ার সুপারিশ করা হবে। অর্থমন্ত্রী আশ্বস্ত করছেন, অর্থনীতিকে বেগবান করতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে বিএবি চেয়ারম্যান বলেন, ঋণখেলাপিদের ক্যাটাগরিভিত্তিক তালিকা এ মাসের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত অনেক জটিলতা আছে। আমলাতন্ত্রিক জটিলতা সহজ করা হবে বলেও অর্থমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন।

নজরুল ইসলাম আরও বলেন, অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক নয়। ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার খেলাপি ঋণের হিসাব করলে দেখা যাবে বাংলাদেশ অনেক ভালো অবস্থানে আছে। এখানকার বেসরকারি খাতে খেলাপি ঋণ ৬ থেকে ৭ শতাংশ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে একটু বেশি। দুটি মিলে ১১ বা ১২ শতাংশ হয়। এটা খুব বেশি নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মন্তব্য করুন