সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও দূরদর্শী ও যত্নবান হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা (জাইকা)। গতকাল পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের সঙ্গে এক বৈঠকে জাইকার প্রতিনিধিরা এ পরামর্শ দেন। বাংলাদেশ জাইকার প্রধান প্রতিনিধি হিতোশি হিরাতার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনামন্ত্রীর দপ্তরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী সাংবাদিকদের আলোচনার তথ্য দেন।

মন্ত্রী জানান, জাইকা চায় সরকার এমন প্রকল্প নেবে, যার শতভাগ সুফল জনগণ পাবে। কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে নয় তারা। জনগণের জন্য প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি থেকে অনুমোদন পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ আরও দ্রুত সময়ে শেষ করারও পরামর্শ দিয়েছে জাইকা। এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে কাজও ইতিমধ্যে শুরু করেছে জাইকা।

মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, জাইকার অর্থায়নে ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি-৬) বা চলমান মেট্রোরেলের কাজ ২০২২ সালে শেষ হবে। এই মেট্রোরেল উত্তরা থেকে আগারগাঁও হয়ে মতিঝিলে শেষ হবে। উড়ালপথে মেট্রোরেলের পর ঢাকায় প্রথম পাতাল রেল লাইন নির্মাণেও ঋণ দেবে জাপান। জাইকার অর্থায়নে পাতাল রেল নকশার কাজ চলছে। ২০২২ সালে পাতাল রেল বা এমআরটি-১ প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু করা যাবে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালে শেষ করা যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, মাঝখানে হলি আর্টিসান ঘটনার কারণে মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এখন পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ দেশে কর্মরত জাপানের নাগরিকরা এখন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নেই। সরকারের নেওয়া নিরাপত্তা কার্যক্রমে তারা সন্তুষ্ট। তিনি আরও বলেন, জাইকা প্রতিনিধি দল তাকে জানিয়েছে, জাপানের অর্থায়নে চলমান মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্য প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ঠিকঠাক মতো এগোচ্ছে। গতি ভালোই আছে। সময়মতো সব প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে তারা আশাবাদী।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ঢাকার কাছে আড়াই হাজারে জাপানি বিনিয়োগকারীর জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে জাপানের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রকল্প ঋণের বিষয়ে জাইকার প্রতিনিধিরা আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে সরকার চায়, জাইকা রেল খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসুক। প্রতিনিধি দলের কাছে রেলপথের উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ সময় মন্ত্রী আরও বলেন, আগামীতে জাইকা এ দেশে ঋণপ্রবাহ আরও বাড়াবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। ঋণ ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়লে জাইকার ঋণও যে অনুযায়ী বাড়বে।

৩৯তম লোন প্যাকেজের আওতায় ছয় প্রকল্পে জাইকার সঙ্গে ১৮০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি হয় গত অর্থবছরের শেষের দিকে। চলতি অর্থবছরের শেষ দিকে ৪০তম প্যাকেজের জন্য চুক্তি সই হবে। এ প্যাকেজে জাইকার কাছ থেকে ২৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়া যাবে। ইতিমধ্যে জাইকা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রাথমিকভাবে ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ সবচেয়ে সহজ শর্তে ঋণ পায় জাইকার কাছ থেকে। জাইকার নতুন ঋণের সুদহার হতে পারে ১ শতাংশ। দশ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ত্রিশ বছরে পরিশোধ করতে হবে এ ঋণ।

৪০তম লোন প্যাকেজে এমআরটি-১ সহ মোট পাঁচ প্রকল্পে ঋণ পাওয়া যাবে। প্রকল্পগুলো হলো- মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, এমআরটি-১, বিদেশি বিনিয়োগ সহায়ক প্রকল্প জ্বালানি দক্ষতা ও সুরক্ষা সহায়ক প্রকল্প। প্রস্তাবিত ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি-১) প্রকল্পের আওতায় পাতাল রেলের দুটি অংশ থাকবে। প্রথমটি হবে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত। এর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় সাড়ে ১৬ কিলোমিটার। দ্বিতীয় অংশটি হবে নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত মোট ১০ দশমিক ২০ কিলোমিটার।

মন্তব্য করুন