বেসরকারি খাতে ১০০ কোচ মেরামত করতে চায় রেল

পরিকল্পনা কমিশন চায় রেলওয়ের কারখানায় হোক

প্রকাশ: ১৬ মে ২০১৯      

মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন

পূর্বাঞ্চল রেলের ৯৩৩ মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচের মধ্যে ৪৯২টির আয়ুস্কাল পার হয়েছে অনেক আগে। জরাজীর্ণ কোচগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে সময়ও লাগে অনেক। একই সঙ্গে রাজস্ব বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পাওয়ায় কোচগুলো যথাসময়ে মেরামতও সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে যথাযথভাবে মেরামত না হওয়ায় এগুলোর অবস্থা আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় একটি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১০০ যাত্রীবাহী কোচ বা ক্যারেজ মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেলওয়ের জনবলের ঘাটতির কারণে এ কাজে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৭ কোটি টাকা। রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।

কমিশন প্রকল্প প্রস্তাব যাচাই শেষে বলেছে, বেসরকারি সংস্থার পরিবর্তে রেলওয়ের কারখানায় নিজস্ব লোকবল দিয়ে মেরামত করলে খরচ অনেক কম হবে। এ প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনে শূন্য পদে নিয়োগ দিয়ে পাহাড়তলী রেলওয়ে কারখানায় কোচগুলো মেরামত করা হলে তা অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয় হবে।

রেলের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন একটি কোচের অর্থনৈতিক আয়ুস্কাল ধরা হয় ৩৫ বছর। এ মেয়াদ শেষে একটি কোচ মেরামত বা পুনর্বাসন করা হলে ফের অন্তত ১২ বছর ব্যবহার করা যায়। এ বিষয়ে রেলের মহাপরিচালক কাজী রফিকুল আলমের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে বিদেশে অবস্থান করছেন জানিয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, অন্য একটি প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ১০০ যাত্রীবাহী কোচ পুনর্বাসনের কাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৫০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ম্যাধ্যমে এবং ৫০টি পাহাড়তলী কারখানার কর্মীদের মাধ্যমে এগুলো পুনর্বাসন করা হয়। কারখানার কর্মীরা কর্মঘণ্টা হিসাব করে এসব কাজ করেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও মূলত রেলওয়ের শ্রমিকরাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেছেন। এতে সময় বেশি লাগে এবং খরচও বেশি হয়। এ কারণে রেলওয়ের নিজস্ব কর্মীদের মাধ্যমে মেরামত কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।

প্রকল্পটির ওপর মতামত দিতে গিয়ে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) কর্মকর্তারা বলেন, রেলের কোচ কিংবা ইঞ্জিন মেরামত হয় রাজস্ব খাতের মাধ্যমে। সেবার মান বাড়াতে প্রতি অর্থবছরই কিছু ক্যারেজ মেরামত করা হয়। এখন উন্নয়ন বাজেট থেকেও মেরামতের কাজ করা হবে। তবে এতে দ্বৈততা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজস্ব বা উন্নয়ন বাজেটে যেভাবেই করা হোক দ্বৈততার কোনো সুযোগ নেই- উল্লেখ করে রেলের কর্মকর্তারা বলেন, মেরামতের পর প্রতিটি ক্যারেজে আলাদা নম্বর দেওয়া থাকে। তাই একবার যেটি মেরামতের কাজ শেষ হয়, সেটি আর তালিকাভুক্ত করা হয় না। তারা বলেন, প্রস্তাবিত ১০০ কোচ রাজস্ব খাতের মাধ্যমে মেরামত করতে ১০ থেকে ১২ বছর সময় লাগবে। এতে কোচগুলোর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হবে। এতে রেলওয়েতে কোচ সংকট দেখা দেবে। জনগণও সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

এদিকে রেল ইঞ্জিন, কোচ ওয়াগন মেরামতে সক্ষমতা বাড়াতে পাহাড়তলী রেল কারখানা পুনর্বাসনে একটি উদ্যোগ নিলেও এক যুগেও তা শেষ করা সম্ভব হয়নি। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বছরের পর বছর। কিন্তু শেষ হয়নি প্রকল্পের কাজ। আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ সময়ে শেষ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য আরও এক বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ করা হলে রেল কোচ, ইঞ্জিন মেরামতের সক্ষমতা

বাড়ত। কিন্তু বাস্তবায়নকারী সংস্থা এক যুগেও ছোট প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে পারেনি। শুরুতে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৪৬ কোটি টাকা। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২১৮ কোটি টাকা করা হয়। সম্প্রতি প্রকল্পের ব্যয় আরও ১০০ কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামে অবস্থিত পাহাড়তলী রেলওয়ে কারখানাটি পূর্ণমাত্রায় ব্যবহারের জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কোচ মেরামতের কাজ দিনে ২ ইউনিট থেকে ৪ ইউনিটে, রেলওয়ে ওয়াগন দিনে ৪ ইউনিটের জায়গায় ৬ ইউনিট এবং লোকোমোটিভ (রেল ইঞ্জিন) মেরামত মাসে ২ দশমিক ৫ ইউনিট থেকে চারটিতে উন্নীত হবে। বর্তমানে

রেলওয়ের ৫০০ থেকে ৬০০ কোচ মেরামতের অপেক্ষায় আছে। পাহাড়তলী রেল কারখানায় পুনর্বাসন কাজ শেষ হলেও এ ক্যারেজগুলো স্বল্প সময়ে ওই কারখানায় মেরামত করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। তাই তারা বেসরকারি খাতের মাধ্যমে কাজ করাতে চান।