প্রযুক্তির কারণে নারীর কর্মসংস্থানে ঝুঁকি বেশি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে বক্তারা

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির সম্প্রসারণের কারণে চাকরি হারাচ্ছেন তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা। একই কারণে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। তখন পুরুষের তুলনায় শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। কর্মসংস্থানের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে শ্রমবাজারের জন্য খাতভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল রোববার 'অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন' বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এক অধিবেশনে বিশেষজ্ঞরা এ পরামর্শ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) আয়োজিত সমাজবিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। দু'দিনের সেমিনারে দ্বিতীয় দিনে গতকাল আটটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিইআরের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম এম আকাশ। প্যানেল আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক রুশিদান ইসলাম রহমান এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) শ্রম বিশেষজ্ঞ কিশোর কুমার সিং।

এম এম আকাশ বলেন, অনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কী পরিমাণ কর্মসংস্থান হবে এবং কোন খাতে কর্মসংস্থানের ঘাটতি আছে, তার ম্যাপিং করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে শ্রমঘন শিল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রযুক্তির কারণে কৃষি খাতে এখন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে শিল্প ও সেবা খাতের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়াতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিল্প ও কর্মসংস্থানমুখী বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।

সায়মা হক বিদিশা বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কারণে উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। এতে কর্মসংস্থান কমবে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির প্রভাবে কোন খাতে কেমন প্রভাব পড়বে, তা জানতে গবেষণা করা জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে নারীরা। তিনি বলেন, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব, বাল্যবিয়ে এবং গর্ভধারণের কারণেও নারীর কর্মসংস্থান কমেছে।

তিনি বলেন, বতর্মানে যুব সমাজের মধ্যে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বেকার। এর মধ্যে পুরুষের বেকাত্বের হার ৮ দশমিক ২ শতাংশ আর নারীদের ১৫ শতাংশ। বেকার যুব সমাজের ৩০ শতাংশেরই কোনো শিক্ষা কিংবা কোনো দক্ষতা নেই।

রুশিদান ইসলাম বলেন, শ্রমশক্তির ৮০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে যুক্ত। চাকরিতে নিরাপত্তা নেই। সামাজিক সুরক্ষা বা পেনশন নেই। নিয়মিত বেতন হয় না। ফলে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে নারীদের জন্য মানসম্মত কাজের ব্যবস্থা করাও চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, শ্রমিক অধিকার সম্প্রসারণ হয়েছে তবে শোভন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। শ্রমঘন কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নীতিমালা তৈরির সুপারিশ করেন তিনি।

কিশোর কুমার সিং বলেন, বাংলাদেশে কোন খাতে কী পরিমাণ কর্মসংস্থান হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারে কাছে কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই। শ্রমবাজারের নীতিমালা তৈরি করতে তথ্য ঘাটতি দূর করা জরুরি। বাংলাদেশে ৭ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে; কিন্তু কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এখন বাংলাদেশকে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কর্মসংস্থাননির্ভর প্রবৃদ্ধিতে যেতে হবে। শুধু দেশে নয়, বিদেশের দক্ষ শ্রমবাজারের সুযোগ নিতে হবে।

পরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সালমা বেগমের সভাপতিত্বে শ্রমবাজার ইস্যু এবং টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ শীর্ষক আরেক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ অধিবেশনে (বিআইডিএসের) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ বলেন, মাতৃত্বকালীন সময়ে অনেক নারী চাকরি হারাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ অনেক সময় ছুটি দিতে চায় না। ছুটি দিলেও অনেকে ওই সময় মজুরি পান না।