আটকে আছে ৫৭২ কোটি টাকার বীমা দাবি

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০১৯      

শেখ আবদুল্লাহ

সুশান্ত কুমার বিশ্বাস ১০ বছর মেয়াদি একটি বীমা পলিসি করেছিলেন বেশ পরিচিত একটি জীবন বীমা কোম্পানিতে। নিয়মিত ৯২ কিস্তি পরিশোধের পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ তিনি মারা যান। এরপর সুশান্ত বিশ্বাসের স্ত্রী তাপসী বিশ্বাস মেডিকেলে পড়ূয়া মেয়েকে নিয়ে ওই কোম্পানির এজেন্ট থেকে শুরু করে প্রধান কার্যালয় সব জায়গায় গেছেন। কিন্তু দেড় বছর পার হলেও বীমা কোম্পানি থেকে কোনো অর্থ পাননি। তাপসী বিশ্বাস জানিয়েছেন, মৃত্যু দাবি দূরের কথা, স্বামীর জমা দেওয়া ৯২ হাজার টাকাই দিতে চাচ্ছে না বীমা কোম্পানি। তাপসী বিশ্বাসের মতো, জীবন বীমার গ্রাহক অনেকেই সময়মতো বীমা দাবি পাচ্ছেন না। প্রতি মাসেই বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে প্রচুর অভিযোগ জমা হচ্ছে। এ অবস্থায় বেশি পরিমাণে অনিষ্পন্ন দাবি রয়েছে এমন ১৪ বীমা কোম্পানির বীমা দাবি নিষ্পত্তি দ্রুত করার জন্য সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করেছে আইডিআরএ। এজন্য সংস্থাটির ৫ কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ হিসাবে বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ৫৭২ কোটি টাকা। জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক দক্ষতা নিয়ে আইডিআরএর সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। যে ১৪ কোম্পানিকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে আনা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- বায়রা লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, চার্টার্ড লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, ডায়মন্ড লাইফ, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ, প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, যমুনা লাইফ, প্রগ্রেসিভ লাইফ, সানলাইফ, বেস্ট লাইফ, ন্যাশনাল লাইফ এবং মেটলাইফ। আইডিআরএর এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বীমাশিল্পের বিকাশের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি বীমা প্রতিষ্ঠানের দাবি পরিশোধের হার অত্যন্ত কম হওয়ায় এ খাতে আস্থার সংকট রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বীমাগ্রহীতারা ব্যাপকহারে লিখিত অভিযোগ জানাচ্ছেন। মৌখিকভাবে জানাচ্ছেন অনেকে। এসব অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বীমা কোম্পানি দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নিচ্ছে এবং জবাবদিহির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

আইডিআরএর সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর অনিষ্পন্ন দাবি ৫৭২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২ লাখ ৭১ হাজার ২৪০টি পলিসির দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদাবি, মেয়াদোত্তীর্ণ দাবি, মেয়াদপূর্তির আগে বীমা ভেঙে ফেলা, সার্ভাইভাল বেনিফিট এবং গোষ্ঠী ও স্বাস্থ্যবীমার দাবি রয়েছে। এছাড়া সেপ্টেম্বর শেষে ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৯৬৩টি পলিসি তামাদি অবস্থায় রয়েছে।

আইডিআরএর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মেটলাইফের অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ৫৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। প্রগ্রেসিভ লাইফের ৪০ কোটি ৯৪ লাখ ও পদ্মা ইসলামী লাইফের ২৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। সানলাইফের ১৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকার বীমা দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। গোল্ডেন লাইফের ৬৭ কোটি এবং বায়রা লাইফের ১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকার বীমা দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। ন্যাশনাল লাইফের অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ৯৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা করপোরেশনের অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ১৮৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। মেঘনা লাইফের ১৭ কোটি ৯৩ লাখ এবং সন্ধানী লাইফের ১৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকার বীমা দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। আইন অনুযায়ী পলিসির মেয়াদপূর্তির ৯০ দিনের মধ্যে দাবি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ৯০ দিনের পরে পরিশোধ করা হলে অতিরিক্ত সময়ের জন্য ব্যাংক রেটের সঙ্গে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ যোগ করে সুদ দিতে হবে। কিন্তু এ নিয়ম মানছে না কোম্পানিগুলো।

আইডিআরএর সদস্য গোকুল চাঁদ দাস সমকালকে বলেন, মোট জীবন বীমার প্রায় ৮০ ভাগ দাবি সময়মতো নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু কিছু কোম্পানি রয়েছে তাদের পলিসির বড় অংশ অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। যে কারণে পুরো খাতে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতা রয়েছে। আইডিআরএ চাইছে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে।

বাংলাদেশ ইন্সুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন এ বিষয়ে বলেন, বীমা দাবি নিষ্পত্তির একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়াতেই কিছু সময় যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই নিয়মতান্ত্রিক সময়ের চেয়েও বেশি সময় লাগানোর অভিযোগ রয়েছে। সেটা সত্যও বটে। সম্প্রতি ১৪ কোম্পানির দাবি নিষ্পত্তি দ্রুত করার জন্য আইডিআরএ যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক।

সানফ্লাওয়ার ইন্সুরেন্সের সিএফও নাসির উদ্দিন এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, কোম্পানিগুলো চায় সকল দাবি সময়মতো নিষ্পত্তি করতে। কিন্তু দাবির প্রকার, গ্রাহকের ভুল ত্রুটিসহ নানান জটিলতায় তা হয় না। কোনো দাবির অর্থ ছাড় করার আগে গ্রাহকদের থেকে বেশকিছু সনদপত্র নিতে হয় বীমা কোম্পানিকে। অনেক সময় গ্রাহকরা সেগুলো সময়মতো দিতে পারেন না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্ত করতে হয়। এসব কারণে দেরি হয়। আর মেয়াদ পূর্তির পরেও ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন ধরনের কাজে সময় লেগে যায়।