আরও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন চান উদ্যোক্তারা

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯      

বিশেষ প্রতিনিধি

বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীরা পিপলস লিজিংয়ের মতো দুরবস্থায় থাকা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও অবসায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন। এর কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, ওইসব প্রতিষ্ঠানের কারণে লিজিং ব্যবসায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

উদ্যোক্তা ও শীর্ষ নির্বাহীদের এমন পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ খাতের অন্যান্য নাজুক প্রতিষ্ঠানের বিষয়েও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন। তবে সতর্কতার সঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে গতকাল বুধবার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিনির্ধারক পর্যায়ের শীর্ষ ব্যক্তিরা এসব কথা বলেন। বৈঠকে ব্যাংকবহির্ভূত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও শীর্ষ নির্বাহীরা এ খাতের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে এর সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করেন। এ খাতের চলমান সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলাম, অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা এস কে সুর চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, অনিয়মের কারণে পিপলস লিজিংয়ের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পিপলসের মতো এ রকম আরও চার প্রতিষ্ঠান 'সন্দেহজনক' অবস্থায় আছে। এগুলোতে বিশেষ নিরীক্ষা চলছে। নিরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, বেসরকারি খাত হচ্ছে অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এ ক্ষেত্রে লিজিং কোম্পানিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কাজেই সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বৈঠকে লংকান অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান জওহর রিজভী ও ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের পরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, পিপিলস লিজিংয়ের মতো এ রকম যেসব প্রতিষ্ঠান সংকটে রয়েছে, সেগুলোকে শিগগির অবসায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এর কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, ওইসব প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো লিজিং ব্যবসার বদনাম হচ্ছে। একমাত্র সমাধান হচ্ছে অবসায়ন করে দেওয়া। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।

বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র বলেছে, দুটি প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের জন্য সরকারের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়। এর মধ্যে পিপলস লিজিংয়ের বিষয়ে অনুমতি পাওয়া গেলেও বিআইএফসির বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সূত্র আরও বলছে, সরকার আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়। এ জন্য এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইন যুগোপযোগী করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে এ বিষয়ে কাজ চলছে।

এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক কমিশন গঠন করা হবে। তবে কবে গঠন করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলেননি তিনি। তিনি জানান, কমিশন গঠনের আগে অনেক প্রয়োজনীয় কাজ আছে। সেগুলো করতে হবে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য আইন-কানুন ও বিধি সংশোধন করতে হবে। এসব কাজ সম্পন্ন হলে প্রয়োজন হলে ব্যাংক কমিশন গঠন করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি মনে করেন, কমিশন গঠন করলেই ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না। কমিশনের কাজ হবে বর্তমান কার্যক্রম দেখভাল করা।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণ আদায় করতে গেলেই গ্রহীতারা আদালতে যান। আইনের দুর্বলতা রয়েছে। ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো দেখা হচ্ছে। খেলাপি ঋণের মামলা যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সে লক্ষ্যে উচ্চ আদালতে আলাদা একটি বেঞ্চ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ এ সংক্রান্ত সব আইন সংশোধনের কাজ চলছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

সংশ্নিষ্টরা জানান, মালিকপক্ষের অনিয়মসহ নানা কারণে চরম সংকটে রয়েছে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সাধারণ গ্রাহক তো দূরের কথা, অনেক ব্যাংক এখন এগুলো থেকে টাকা ফেরত পাচ্ছে না। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারাসহ বিভিন্ন অনিয়মে ধুঁকতে থাকা পিপলস লিজিং অবসায়নের উদ্যোগের পর এ খাতের সংকট আরও প্রকট হয়েছে। ভালো অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও সাধারণ গ্রাহকের পাশাপাশি অনেক ব্যাংক টাকা তুলে নিয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে গত ২৩ আগস্ট বেশ কয়েকটি ভালো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অর্থ উত্তোলন ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ তহবিল সহায়তা দেওয়া যায় কি-না সে দাবি জানান।