ক্ষতি ৫শ'কোটি টাকা

কোরবানির চামড়া নিয়ে কারসাজির জের

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯      

মিরাজ শামস

ক্ষতি ৫শ'কোটি টাকা

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায় বিক্রি করতে না পেরে প্রতিবাদ হিসেবে সংগৃহীত চামড়া মঙ্গলবার রাস্তায় ফেলে যান মৌসুমি ব্যবসায়ীরা মো. রাশেদ

এবার ঈদের কোরবানির পশুর চামড়ার দরে বিপর্যয় হয়েছে। এর ফলে আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান খাত সংশ্নিষ্টরা। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এবার ঈদে গরুর ৩৫ শতাংশ এবং ছাগলের ৮০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়েছে। তাছাড়া যে চামড়া কেনাবেচা হয়েছে তাও নির্ধারিত দরের অনেক কম। যেমন খুশি তেমন দামে এবার চামড়া বিক্রি হয়েছে।

জানা যায়, চামড়ার দাম না পাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথায় পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আবার কোথায় নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। দর না থাকায় চামড়া সঠিকভাবে সংগ্রহে জোর দেননি ব্যবসায়ীরা। এতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চামড়া বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। ফলে গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি চামড়া এবার নষ্ট হয়েছে। এ জন্য আড়তে নিয়ে এসেও দাম না পেয়ে চামড়া ফেলে দিতে হয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। চামড়া না কেনার আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়ে কম দামে কেনার সুযোগ নিয়েছেন এবার ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা। তবে তারা কম দামে কিনলেও সব চমড়া সংগ্রহ করে সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে দরিদ্র মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।

চামড়া খাত বিশেষজ্ঞ ও সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঈদে এক কোটির বেশি পশু জবাই হয়েছে। এই পশুর চামড়া অন্যান্যবারের মতো নির্ধারিত দরে বিক্রি হলে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার লেনদেন হতো। এই লেনদেনের প্রথম ধাপে মাঠ পর্যায়ের কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কিনে নেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আবার আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন। আড়তদারদের কাছ থেকে কিনে নেন ট্যানারি মালিকরা। আবার ঢাকার চামড়া সরাসরি কিনে নেন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা। এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ চামড়া আড়তদারদের কাছে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখন ট্যানারি মালিকরা কিনবেন। কেনার আগে শুরুতেই দাম কমিয়ে বেচাকেনায় কারসাজি করেছেন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা। চামড়া নিয়ে এবার অরাজকতার কারণে লেনদেনের পরিমাণ অর্ধেকেরও কম হবে। কারণ, এবার ঈদে ৫৫ থেকে ৬০ লাখ গরুর চামড়ার মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ফেলে দেওয়া হয়েছে। আর ২০ শতাংশ অল্প নষ্ট হওয়ায় ২০ থেকে ৮০ টাকায় বেচাকেনা হয়েছে। বাকি চামড়া ১০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে বেশিরভাগ কেনাবেচা হয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে ছাগলের চামড়ায়। ঈদে ছাগল ও ভেড়ার ৪০ লাখ চামড়ার মধ্যে সারাদেশে দুই লাখ চামড়া সংগ্রহ করেননি ব্যবসায়ীরা। চামড়া ফেলে দেওয়া ও নষ্ট হওয়ায় সরাসরি আড়াইশ' কোটি টাকার সম্পদ হারাতে হয়েছে। পাশাপাশি দামে ধস নামায় আরও ২৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আর এই কম দামে এবার চামড়া কিনে ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা লুফে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছেন আড়তদার, ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকরা।

গতকাল রাজধানীর কাঁচা চামড়ার আড়ত ঘুরে দেখা যায়, অন্য বছরের চেয়ে এবার আড়তে চাড়ার স্তূপ কম রয়েছে। দু-চারটি ছাড়া বেশিরভাগ আড়ত ছাগলের চামড়া সংরক্ষণ করেনি। আড়তদার ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশের মধ্যে ঢাকার চামড়ার মান ভালো হওয়ায় ট্যানারি মালিকদের কাছে কদরও সবচেয়ে বেশি। কিন্তু গত বছরের তুলনায় এবার লালবাগের পোস্তার আড়তে প্রায় অর্ধেক চামড়া সংরক্ষণ হয়েছে। সারাদেশে আরও কম চামড়া সংরক্ষণ হয়েছে বলে মনে করছেন আড়তদার ব্যবসায়ীরা। ছাগলের চামড়া কেনেননি বেশিরভাগ আড়তদার। আড়তে ছাগলের চামড়া নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দু-চারজন কিনলেও প্রতিটি ছাগলের চামড়া চার থেকে ১০ টাকা দিয়েছেন। এতে অনেকেই রিকশা ভাড়াও পাননি।

পোস্তার আড়তের ব্যবসায়ী মো. হাফিজ গতকাল ৫০টি চামড়া কিনেছেন ২০০ টাকায়। তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকরা পাওনা টাকা সব পরিশোধ না করায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ৮টি ট্যানারি মালিকের কাছে তার তিন কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। তা থেকে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা এবার ঈদে পাওয়া গেছে। এই টাকায় নির্ধারিত দরে চামড়া কেনা সম্ভব নয়। তিনি অন্যান্য বছর পাঁচ থেকে ছয় হাজার চামড়া কিনলেও এবার মাত্র তিন হাজার চামড়া কিনেছেন। এর মধ্যে দুই হাজার ২০০ চামড়া বাকিতে কিনেছেন। যারা বাকিতে রেখে গেছেন তাদের কাছ থেকেই বেশিরভাগ আড়তদার চামড়া নিয়েছেন। মাঠ পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাতে টাকা না থাকায় চামড়ার দামে বিপর্যয় এসেছে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, এবার আড়তদাররা খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। এবার কোরবানির পশুর চামড়ার মধ্যে ৩৫ শতাংশ গরুর চামড়া নষ্ট হয়েছে বা ফেলে দেওয়া হয়েছে। খাসির চামড়া ৮০ শতাংশ ট্যানারিতে আসবে না। এ অবস্থায় কাঁচা চামড়া রফতানি করা হলে চামড়া শিল্প হুমকিতে পড়বে। শিল্প রক্ষায় কাঁচা চামড়া রফতানি বন্ধের আহ্বান জানান তিনি।