এনডিটিভিকে নোবেল জয়ী অভিজিৎ

অর্থনৈতিক চিন্তায় পক্ষপাতিত্ব করি না

আমরা যে কোনো সরকারের সঙ্গেই কাজ করি

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০১৯      

শিল্প ও বাণিজ্য ডেস্ক

অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া দ্বিতীয় বাঙালি অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এখন আলোচনা-সমালোচনা বেশ তুঙ্গে। নোবেল ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি যখন জন্মভূমিতে এসেছেন, তখন অর্থনীতির বাইরে অপ্রিয় বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়েও কথা হচ্ছে। এসব বিষয়ে অকপটে কথা বলেছেন। এনডিটিভির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কেন্দ্রীয় এক মন্ত্রীর সমালোচনার জবাব দিয়েছেন জোরালোভাবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রসঙ্গও এসেছে তাতে।

দেশের মাটিতে পা রেখে অভিজিৎ প্রথমেই তার মাস্টার্স পড়াশোনার ক্যাম্পাস জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছেন বলে আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সেখানে নোবেল পাওয়াকে নিছক 'বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়া' বলে উল্লেখ করেছেন। মনে করিয়ে দেন, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ও তিনি একই সময়ে এখানে পড়েছেন। ১৯৮৩ সালে তিনি যখন এমএ পাস করেন, তখন এমফিল করছেন নির্মলা। বন্ধু হলেও অর্থনীতির ঝিমুনি কাটাতে নির্মলার নীতি ভুল বলে মন্তব্য করেন অভিজিৎ।

ভারতে এলেও এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে শুভেচ্ছা জানানো হয়নি। যদিও তা নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ তিনি। তার কথায়, 'ওদের অনেক কাজ আছে'। তবে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা। তার সঙ্গে গত ১৪ অক্টোবর নোবেল পুরস্কার পান স্ত্রী এস্থার ডাফলো ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল ক্রিমার। অভিজিৎ ও ডাফলো দু'জনই যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক।

৫৮ বছরের অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্টু্কলজীবন কেটেছে কলকাতাতেই। সাউথ পয়েন্ট স্টু্কল থেকে পাস করে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা শুরু। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক হন। ১৯৮৩ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেন। ১৯৮৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের এ নাগরিক। তার বাবা দীপক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতির কিংবদন্তি অধ্যাপক।

এ দিকে নোবেলজয়ী এ অর্থনীতিবিদকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে কলকাতা পৌরসভা। তাকে ডিলিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তার স্ত্রী ডাফলো ও মাইকেল ক্রেমার এবং আরেক নোবেলজয়ী বাঙালি অমর্ত্য সেনকেও এ সম্মানে ভূষিত করা হবে।

ভারতে আসার পর এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ নীতির ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হলেও কাজ করার ক্ষেত্রে 'পেশাদারিত্ব' বজায় রাখার ওপরে জোর দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারের সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতাদের ক্রমাগত আক্রমণের বিষয়টিও সামনে আসে। নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করেননি তিনি। আক্রমণের মুখেও অকপট থেকেছেন। সরকারি নীতির ফলে নির্বাচনী জয় হয়, এমন তত্ত্ব মানতে নারাজ তিনি। তবে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তার কৃতিত্ব যে তাকে দিতেই হবে, তাও নিঃসংকোচে বলেছেন এ নোবেলজয়ী। সেসঙ্গে জানিয়েছেন, মোদির জয় মানেই এটা ঠিক নয় যে, তার নেওয়া সব সিদ্ধান্তই সঠিক।

অভিজিৎকে নিয়ে কেন্দ্রীয় রেল ও বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালের মন্তব্য নিয়ে বিপুল হইচই হয়। তাকে 'বামপন্থি মনোভাব ঘেঁষা' বলেছিলেন তিনি। এর প্রেক্ষিতে অর্থনীতি সম্পর্কে তার ভাবনা নিরপেক্ষ বলে জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমার অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনায় পক্ষপাতিত্ব করি না। আমরা অনেক রাজ্য সরকারের সঙ্গে কাজ করেছি, তার মধ্যে বেশিরভাগই বিজেপি সরকার। যখন নরেন্দ্র মোদি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময় আমরা গুজরাটের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সঙ্গে কাজ করেছি এবং আমাদের দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে।

দেশের গরিব মানুষের প্রত্যেক ২০ শতাংশ পরিবারকে বার্ষিক ৭২ হাজার টাকা আয় বা নূ্যনতম আয় যোজনা অর্থাৎ ন্যায় প্রকল্প তৈরিতে কংগ্রেসকে সাহায্য করেছিলেন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। দিল্লিতে এনডিটিভির সঙ্গে কথা বলার সময় অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'কংগ্রেসের জায়গায় যদি বিজেপি আমায় জিজ্ঞাসা করত, একটি নির্দিষ্ট আয়ের হার কত, তাহলে কি আমি সত্যিটা বলতাম না? আমি তাদের ঠিকটা বলেছিলাম, আমি ইচ্ছুক ছিলাম। একজন পেশাদার হিসেবে আমি সবার সঙ্গে পেশাদারিত্ব রাখি।'

অভিজিৎ বলেন, 'আমরা বিশেষজ্ঞ, যাদের বিশেষ কিছু বলার রয়েছে। তাদের নীতির মূল্যায়ন করতে কোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতেই আমাদের কোনো সমস্যা ছিল না। আমরা সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব এবং ইচ্ছের মূল্য দিই।'