হিসাব খুলতেই ১১ বছর

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯      

শেখ আবদুল্লাহ

২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা রুটে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন চলছে। বাংলাদেশ ও ভারতের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী মৈত্রী এক্সপ্রেস থেকে যে আয় হবে তার ৭৫ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বাকি ২৫ শতাংশ পাবে ভারত রেলওয়ে। দুই দেশের রেলের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ের মাধ্যমে এই অর্থ ভাগাভাগি করে নেওয়ার কথা। কিন্তু গত ১১ বছরেও এই অর্থ লেনদেনের হিসাবই খোলা হয়নি। ফলে বাংলাদেশের আয়ের অংশ পড়ে আছে ভারতে। আর ভারতের আয়ের অংশ পড়ে আছে বাংলাদেশে। ভারত যে অর্থ পায়, তার দ্বিগুণ অর্থ পাওনা রয়েছে বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষের।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মৈত্রী এক্সপ্রেসের আয় বণ্টন ও স্থানান্তরে যাতে বাজেটে কোনো ধরনের প্রভাব না পড়ে এবং যাতে যে কোনো সময় ভারতীয় পাওনা অংশ স্থানান্তর করা যায়, সে জন্য ভারতীয় পাওনা অংশ একটি সাসপেন্স খাতে রাখার কথা ছিল। কিন্তু গত ১০ বছরেও এই সাসপেন্স হিসাব খোলা হয়নি। সব আয় যাত্রী ভাড়া খাতে জমা হচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ভারতীয় অংশের টাকা পাঠানো ও নিজেদের অংশের টাকা আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালককে (অর্থ)। এ প্রেক্ষিতে ফরেন রেলওয়ে নামে একটি সাসপেন্স হিসাব খোলার অনুমোদন চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, মৈত্রী এক্সপ্রেস চলাচলের শুরু থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাব শেষ করেছে দুই দেশ। এতে দেখা গেছে ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশের পাওনা ৯ কোটি ২৯ লাখ ৩৬ হাজার ৮৮১ রুপি। বর্তমানে ১০০ ভারতীয় রুপি সমান বাংলাদেশি ১১৯ টাকা। সেই হিসাবে বাংলাদেশের পাওনা ১১ কোটি ৬ লাখ টাকা। আর বাংলাদেশের কাছে ভারতীয় রেলের পাওনা ৪ কোটি ৭৪ লাখ। এই অর্থ দেশে আনার বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেই।

রেলওয়ের আয় থেকে ব্যয় করার সুযোগ নেই। সে জন্য সঠিক হিসাব সংরক্ষণ ও জটিলতা নিরসনে ভারতীয় অংশের প্রাপ্য অর্থ একটি সাসপেন্স হিসাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ রেলওয়ে কোড ফর অ্যাকাউন্ট ডিপার্টমেন্টের চ্যাপ্টার ১৫-এর ১৬১৪ প্যারাগ্রাফে ফরেন রেলওয়ে নামক একটি সাসপেন্স খাত উল্লেখ রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে ডিপোজিট মিস (ফরেন রেলওয়ে প্যাসেঞ্জার) নামে সাসপেন্স হিসাব খুলে মৈত্রী ও বন্ধন ট্রেনের ভারতীয় অংশের অর্থ সেই হিসাবে জমা করতে চায় রেলওয়ে মন্ত্রণালয়। তবে এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতামত ভিন্ন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এর আগে নৌ প্রটোকল অনুযায়ী বাংলাদেশের পাওনা ফি আদায়ের জন্য ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতে একটি রুপি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। সেই রুপি অ্যাকাউন্টে অনেক অর্থ জমা হলেও তা দেশে আনা যাচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিএ ওই অ্যাকাউন্টের জমার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা পেলেও বাংলাদেশ ব্যাংক ভারতে জমা অর্থ কোনো কাজে লাগাতে পারছে না। এ জন্য রেলওয়ের এ অর্থ আনতে কোন ধরনের হিসাব খোলা হবে তা পর্যালোচনা করা দরকার। পাশাপাশি দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্থানীয় মুদ্রা হিসাব খুলে লাভ বিশেষ হবে না।

এদিকে ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে খুলনা-কলকাতা-খুলনা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করছে। ফলে বাংলাদেশের আয় বাড়ছে। মৈত্রী এক্সপ্রেসের বাংলাদেশি ট্রেন সপ্তাহে দু'দিন শুক্রবার ও রোববার ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়। আর শনি ও সোমবার কলকাতা থেকে ছেড়ে আসে। আর ভারতীয় ট্রেনও সপ্তাহে দু'দিন শুক্রবার ও মঙ্গলবার কলকাতা থেকে ছেড়ে যায়। আর শনি ও বুধবার ঢাকা থেকে কলকাতার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। প্রতিটি ট্রেনে ১৪৪টি কেবিন সিট রয়েছে। আর চেয়ার সিট রয়েছে ৩১২টি। পুরো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই ট্রেনের কেবিনের প্রতিটি সিটের ভাড়া ২৫২২ টাকা (ভ্যাট ও ভ্রমণ কর বাদে)। আর প্রতিটি চেয়ার সিটের ভাড়া ১৭৪৮ টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে এই ৪৫৬ সিট আগে থেকেই বুকিং হয়ে থাকছে বলে জানা গেছে। কোনো সিটই খালি যাচ্ছে না। ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা, বেড়ানো, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কারণেই বাংলাদেশিদের ভারত ভ্রমণ বেড়েছে।