ঋণ অবলোপন নীতিমালা আপাতত শিথিল নয়

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

ওবায়দুল্লাহ রনি

ব্যাংকগুলো জোরালো দাবি তুললেও ঋণ অবলোপন নীতিমালায় আপাতত হাত না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবলোপন করে খেলাপি ঋণ কমানোর চেয়ে ব্যাংকগুলোকে আদায় কার্যক্রম বাড়ানোর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আদায় বেড়ে খেলাপি কমলে তাতে সুদহারও কমবে।

ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের একটি প্রতিনিধি দলকে সম্প্রতি ঋণ অবলোপন নীতিমালার বিষয়ে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এ নীতিমালায় শিথিলতা চেয়ে গভর্নর ফজলে কবিরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ৭ নভেম্বর সাক্ষাৎ করে প্রতিনিধি দলটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্নিষ্টরা জানান, সাধারণভাবে খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে থাকলে তা ব্যাংকের স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক বিবেচনা করা হয়। তাই বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পরিস্কার রাখতে খেলাপি ঋণ কমানোর সহজ পন্থা হিসেবে অবলোপনকে বেছে নিচ্ছে অনেক ব্যাংক। এক টাকা আদায় না করেও অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো হচ্ছে। এ প্রবণতা সুদহারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কেননা ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডাররা প্রতিবছর ভালো লভ্যাংশ পেতে চান। তবে ঋণ অবলোপন বাড়লে সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে গিয়ে লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ কমে যায়। আবার অনেক সময় গ্রাহককে না জানিয়েও ঋণ অবলোপন করার অভিযোগ রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের বেকায়দায় পড়েন। কেননা একবার অবলোপন হলে সমুদয় পাওনা পরিশোধ ছাড়া সংশ্নিষ্ট ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ থাকে না ব্যবসায়ীদের। এতে অনেকে পথেও বসে যান।

ব্যাংক ব্যবস্থায় মন্দমানে শ্রেণীকৃত খেলাপি ঋণ ব্যালান্স সিট বা স্থিতিপত্র থেকে বাদ দেওয়াকে ঋণ অবলোপন বলে। আর্থিক প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে। এ ধরনের ঋণগ্রহীতা পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন। একটি সময় যে কোনো অঙ্কের খেলাপি ঋণ অবলোপনের আগে মামলা করা বাধ্যতামূলক ছিল। তবে অনেক সময় মামলার খরচের চেয়ে বকেয়া ঋণ কম হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে এ নীতিমালা শিথিল করে মামলা না করে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনের সুযোগ দেওয়া হয়। তখন মন্দমানে খেলাপি হওয়ার অন্তত তিন বছর পর অবলোপন করা যাবে বলা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে অবলোপন প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে গত জুন পর্যন্ত মোট ৫৪ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। বর্তমানে বকেয়া রয়েছে ৪১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। এ রকম অবস্থায় খেলাপি ঋণ না কমে বেড়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ২২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা বেড়ে এক লাখ ১৬ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গত নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে বৈঠক করে নীতিমালায় আরও শিথিলতা চান ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা। তারা বলেন, সরকার চাইছে খেলাপি ঋণ কমাতে। ঋণ অবলোপন নীতিমালা কঠোর করায় তা সম্ভব হচ্ছে না। এ রকম বাস্তবতায় তিন বছর পার হওয়ার পর অবলোপনের শর্ত তুলে দিয়ে আগের মতো যে কোনো সময় অবলোপনের সুযোগ চাওয়া হয়। সেটি না হলে এক বছর খেলাপি হওয়ার পর যেন অবলোপন করা যায়, সে জন্য নীতিমালায় শিথিলতা চাওয়া হয়। বৈঠকে খেলাপি হওয়ার এক বছর পর অবলোপনের শর্ত আরোপের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা নমনীয় ছিল। তবে সব পর্যালোচনা শেষে অবলোপন নীতিমালা শিথিল করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ব্যাংকের অবলোপন করা ঋণসহ ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ হিসাব করে। ফলে অবলোপন করে খেলাপি কমানো হলেও সেটির কোনো প্রভাব তাদের কাছে পড়ে না। অন্যদিকে, অবলোপনের কারণে অনেক সময় বাড়তি চাপে পড়েন উদ্যোক্তারা। তাই নীতিমালা পরিবর্তন না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।