সৌরবিদ্যুতের আলো ঋষিপাড়ার হস্তশিল্পে

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

ঝিনাইদহের ঘোড়াশাল ইউনিয়নের একটি গ্রাম নারিকেলবাড়ি। গ্রামের মূল সড়ক দিয়ে একটি ইটের ভাঙাচোরা রাস্তা নেমে গেছে ঋষিপাড়ার দিকে। সেখানে বেশ কিছু হিন্দু পরিবার বাস করে। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী। বাড়তি কিছু আয়ের জন্য পরিবারের নারীরা হাতে তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরি করেন। এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি কুলা, ঝুড়ি, হাঁস-মুরগি আটকে রাখার টুকরি ইত্যাদি। এ কাজে তাদের বিশেষ সহায়তা করছে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের টিআর/কাবিটা প্রকল্পের আওতায় সরবরাহ করা সৌরবিদ্যুৎ।

প্রকল্পের অন্যতম অংশীদার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সহযোগী প্রতিষ্ঠান আত্মবিশ্বাস সৌরশক্তি লিমিটেড ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উপজেলার একটি পৌরসভাসহ ১৭টি ইউনিয়নে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি ক্লিনিকে মোট ১১৫৮টি সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করে। এতে বরাদ্দ ছিল দুই কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিপর্যায়ে ৫৩৫টি, ৩৮০টি মসজিদ, ৮৫টি মাদ্রাসা, ৬১টি মন্দির, ৪০টি স্কুল, পাঁচটি কমিউনিটি ক্লিনিক, দুটি পুলিশ ক্যাম্প, ১৪টি চাষি ক্লাব ও ১৮টি ইউনিয়ন পরিষদে সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি অফিস এবং প্রতিষ্ঠানে ১১টি এসি ও ডিসি সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। আর সৌর সড়কবাতি স্থাপন করেছে মোট চারটি। এতে করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপজেলার প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।

ঋষিপাড়ায় শেফালি আর রিপেন দাসের বাড়ি। টিন দিয়ে একচালা দুটি ঝুপড়িতে বসবাস করেন এই দম্পতি ও তার সন্তানরা। রিপেন বাজারে মুচির কাজ করেন। চার মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। মুচির কাজ করে যে টাকা আয় করেন, তা দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। তাই সংসারের বাড়তি কিছু আয়ের জন্য শেফালি দাস বাঁশের ঝুড়ি আর টুকরি তৈরির কাজ করেন। বাঁশ থেকে এগুলো তৈরির জন্য একদিন উপকরণ প্রস্তুত করেন এবং তা থেকে দৈনিক তিন থেকে চারটি ঝুড়ি-টুকরি তৈরি করতে পারেন। এর প্রতিটি আশি থেকে একশ' টাকায় বিক্রি করতে পারেন। এই কাজ করে সে সংসারে কিছু খরচ করতে পারছেন। তার বাড়িতে সরকার এই সৌরবিদ্যুৎ দেওয়ায় বেশ উপকার হয়েছে। তিনি বলেন, 'দিনের বেলায় যে সময় পাই, তখন সংসারের কাজকর্ম করি আর বাঁশ থেকে বেতি তৈরি করি।

রাতে সৌরবিদ্যুতের আলোয় বসে ঝুড়ি তৈরি করি। সৌরবিদ্যুৎ পেয়ে আমাদের খুব উপকার হয়েছে। তাছাড়া ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারছে।'

আরও দু-একটি বাড়ি পরে ষাটোর্ধ্ব সদুবালা রাতে সৌরবিদ্যুতের আলোয় বসে কুলা তৈরি করেন। কারণ, তারাও সরকারের দেওয়া সোলার প্যানেল পেয়েছেন। কুলা তৈরির কাজে তার স্বামী মহন্ত দাসও সাহায্য করেন। বিশেষ করে বাঁশ সংগ্রহ করে আনা, সেগুলো কেটে সাইজ করা, বেতি ওঠানো ইত্যাদি কাজগুলো তিনি করেন। সদুবালা এক হাট থেকে আরেক হাটবার পর্যন্ত অর্থাৎ সাত দিনে ১০-১২টা কুলা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি কুলা ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করতে পারেন।

কেবল এই ঋষিপাড়ায় নয়, গ্রামের অন্য পাড়াতেও অনেক নারী সৌরবিদ্যুতের কল্যাণে জীবনমানের কিছুটা পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। এ রকম এক নারী নারিকেলবাড়ি গ্রামের রেখা বেগম। তিনি সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির বেঁচে যাওয়া নারী শ্রমিক। তার স্বামী অসুস্থ। সেলাই কাজ আর সামান্য একটু জমির ওপর নির্ভর করে তিনি স্বামী সন্তান নিয়ে সংসার নির্বাহ করছেন। তিনিও বলেন, সৌরবিদ্যুৎ পাওয়ায় তার অনেক উপকার হয়েছে। বিদ্যুতের বিল কম হয়। তার সেলাইয়ের কাজের কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। সময়মতো কাস্টমারকে তাদের পোশাক ডেলিভারি দিতে পারেন।