করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি খাতের (সিএমএসএমই) জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ হচ্ছে খুব সামান্য। তহবিল গঠনের তিন মাসে মাত্র ২০৬ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। নানা শর্তের কারণে গ্রাহকদের চাহিদা থাকার পরও ঋণ বিতরণে বিপত্তি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ বিতরণের শর্ত শিথিলের প্রস্তাব করেছে ব্যাংকগুলো।

এসএসএমই ঋণ বিতরণে ধীরগতির কারণ এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংকের মতামত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অধিকাংশ ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমানে সিএমএসএমই খাতের আওতায় ব্যবসা ও সেবা উপখাতে বেশি ঋণ চাহিদা রয়েছে। আর বেশিরভাগ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মেয়াদি ঋণ চাইছেন। অথচ প্রণোদনার আওতায় শুধু চলতি মূলধন ঋণ বিতরণ করা যাবে। মোট ঋণের অন্তত ৫০ শতাংশ উৎপাদন খাতে বিতরণ করতে হবে। আর সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ব্যবসা এবং ৩০ শতাংশ সেবা উপখাতে দেওয়া যাবে।

জানা গেছে, এসএমই খাতের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ শুধু মেয়াদি ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন। সাধারণভাবে তাদের চলতি মূলধন ঋণের প্রয়োজন পড়ে না। আবার প্রণোদনা তহবিলের মেয়াদ হবে তিন বছর। অথচ সরকার ৯ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশ হারে সুদ ভর্তুকি দেবে এক বছরের জন্য। ফলে পরবর্তী ২ বছরে গ্রাহক পর্যায়ে সুদ বৃদ্ধির ফলে ঋণ আদায়ে ব্যাংকের সঙ্গে ঝামেলা হতে পারে। এসব কারণে ঋণ বিতরণ হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রণোদনা তহবিলের আওতায় গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো মাত্র ৫১৮ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ২৮টি ব্যাংক গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করেছে মাত্র ২০৬ কোটি টাকা। বাকি ৩১২ কোটি টাকা বিতরণের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৬ কোটি টাকা বিতরণ করেছে সিটি ব্যাংক। আর সর্বনিম্ন ২ লাখ টাকা দিয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ব্যাংক। এসএমইতে এমন চিত্র থাকলেও বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ঘোষিত ৩০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এরই মধ্যে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশি হওয়ায় এমনিতেই এসএমই খাতে ঋণ বিতরণে বেশিরভাগ ব্যাংক অনীহা দেখায়। এর মধ্যে ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়ায় অনেক ব্যাংক সমস্যায় পড়েছে। এ ছাড়া ভর্তুকির সুদ পেতে ব্যাংকগুলোকে নানা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে কোনো ভুল ধরা পড়লে তখন সুদহারের একটি অংশ ফেরত দিতে হয়। এসব কারণে ব্যাংকগুলো সাধারণত এ ধরনের ঋণ বিতরণে অনাগ্রহ দেখায়।

এসএমই ব্যাংক হিসেবে পরিচিত বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসাইন সমকালকে বলেন, প্রণোদনার ঋণে কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে একটু দেরি হচ্ছে। জুলাই ও আগস্টের পরিস্থিতি দেখলে দেখা যাবে, অনেক ঋণ বিতরণ হয়েছে। প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করতে গিয়ে তারা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানো হয়েছে।

ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই বিভাগের প্রধান সৈয়দ আব্দুল মোমেন সমকালকে বলেন, প্রণোদনার এসএমই ঋণ বিতরণে কিছু সমস্যা রয়েছে। এখান থেকে শুধু চলতি মূলধন ঋণ দেওয়া যাবে। অথচ তাদের কাছে মেয়াদি ঋণের জন্য অনেকেই আসছেন। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসে শুধু চলতি মূলধন ঋণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তা নয়। বরং নতুন করে অনেকের মূলধন বিনিয়োগের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এসএমই খাতে ঋণ বিতরণে ধীরগতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিন্তিত। যে কারণে কয়েকটি ব্যাংক থেকে লিখিত নেওয়া হয়েছে। এখন এসব বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা নির্দেশনা দিয়ে গত ১৩ এপ্রিল সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমে পুরো ঋণ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে বিতরণ করতে বলা হলেও পরবর্তীতে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তার জন্য প্রণোদনা তহবিলের অর্ধেক তথা ১০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়।

মন্তব্য করুন