সা ক্ষা ৎ কা র : আহসান এইচ মনসুর

মুদ্রানীতি ঠিকমতো বাস্তবায়ন না হলে হিতে বিপরীত হবে

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ আবদুল্লাহ

বাংলাদেশ ব্যাংক গত  বুধবার চলতি অর্থবছরের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে এবং হওয়ার শঙ্কা রয়েছে তা কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে মুদ্রানীতির ধরন যথাযথ কিনা এবং এর বাস্তবায়নে কী করতে হবে, তা নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিউিটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ আবদুল্লাহ

করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে তা পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে যত অস্ত্র ছিল তার সবই এবারের মুদ্রানীতিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য তারল্য প্রবাহ বাড়ানো এবং তহবিল ব্যয় কমানো। তবে মনে রাখতে হবে, যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা স্থায়ীভাবে নেওয়া ঠিক হবে না। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বা আগের অবস্থায় ফিরতে হবে। নতুবা মূল্যস্ম্ফীতি বাড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিকেও সরকার খাদ্য মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মূল্যস্ম্ফীতির আশঙ্কা রয়েছে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতির ওপর এমন মতামত জানিয়েছেন পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক এবং বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর।

বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে সেখানে প্রধানত ব্যাংক রেট ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ, রেপো সুদহার ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং রিভার্স রেপোর সুদহার ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া অর্থবছর শেষে সরকারের ঋণে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ আর বেসরকারি খাতের ঋণ ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংক রেট ও রেপোর সুদহার কমানোর ফলে বাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়বে। তহবিলের জন্য ব্যাংকগুলোর ব্যয় কমবে। এই বাড়তি তারল্য যাতে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য মুদ্রানীতি এক বছরের জন্য ঘোষণা করা হলেও তিন মাস ও ছয় মাস পর এর মূল্যায়ন করতে হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে হবে। মুদ্রানীতির উদ্যোগগুলো কীভাবে কাজ করছে তা মনিটরিং করতে হবে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। এর সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেখতে হবে। ঋণ কোথায় যাচ্ছে, উৎপাদনশীল খাতে চাহিদা অনুযায়ী অর্থায়ন হচ্ছে কিনা, খেলাপি গ্রাহকরা নতুন করে ঋণ নিচ্ছে কিনা- এসব কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। এক কথায় বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য প্রবাহ সরবরাহের যে ব্যাপক চেষ্টা নিয়েছে, তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে যে পরিমাণ ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য সরকার ঘোষণা করেছে মুদ্রানীতিতে তার পুরোটাই সংস্থান রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা রয়েছে। সরকারের ঋণের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না। তবে সরকারকে কোন ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থায়ন করা হবে তা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, মুদ্রানীতির উদ্যোগের চেয়ে করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি খাতে আস্থা ফেরানো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণোদনার যে অংশ সরবরাহ করছে এবং বিদেশি সহায়তা বৃদ্ধির কারণে লেনদেন ভারসাম্যের উদ্বৃত্তের কারণে যে অর্থ সরবরাহ বাড়ছে তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি। অন্যদিকে চলমান বন্যার কারণে চালের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমনের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এ জন্য সরকারের উচিত বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো। প্রয়োজনে আমদানিও করা যেতে পারে।

আহসান মনসুর আরও বলেন, মুদ্রানীতি ঘোষণার আগেও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান এখনও ঠিকমতো ঋণ সুবিধা পায়নি। আইটি খাতে ঋণ সুবিধা পৌঁছাচ্ছে না বলে সংশ্নিষ্টরা অভিযোগ করছেন। এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ থাকা দরকার। আরও জরুরি হলো, সময় মতো অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। একদিকে সরকারকে ব্যয় কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় নগদ অর্থ সরবরাহ বাড়াতে হচ্ছে। এ দুটোর মধ্যে সমন্বয় করাও জরুরি। অনানুষ্ঠানিক খাতে সহজ অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টিরও উদ্যোগ থাকা দরকার। মুদ্রানীতির যে ভঙ্গি তা অর্থনীতি গতিশীল করার জন্য যথেষ্ট। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এর সঠিক বাস্তবায়ন। ঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের পরিবর্তে অন্য খাতে অর্থ চলে গেলে তা অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দেবে। নোট ছাপিয়ে টাকার সরবরাহ বাড়ানোর বিপদ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক ভালোভাবেই জানে বলে আশা করি।

পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক বলেন, সম্প্রসারিত মুদ্রানীতির ফলে কারা ঋণ পাচ্ছে, কোন খাতে ঋণ যাচ্ছে, সম্প্রসারিত মুদ্রানীতির প্রভাব কী- এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি অবশ্যই বাড়াতে হবে। নতুবা মূল্যস্ম্ফীতি ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির মতো স্বাভাবিক ঘটনার পাশাপাশি অর্থ পাচারের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এই নজরদারির জন্য প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তৃতীয় কোনো পক্ষকেও নিয়োগ করতে পারে।