সা ক্ষা ৎ কা র : সৈয়দ মাহবুবুর রহমান

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে উদ্ভাবন আনবে এমটিবি

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২০

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। এর আগে ছিলেন ঢাকা ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আগামী ২৪ অক্টোবর এমটিবির ২১ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওবায়দুল্লাহ রনি

সমকাল :২১ বছর পূর্ণ হচ্ছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের। কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মাহবুবুর রহমান :ব্যাংক হিসেবে এমটিবির একটি ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে উঠেছে। ব্যাংকটির প্রতি মানুষের আস্থা আছে। তবে আমরা এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা সবচেয়ে জোর দিচ্ছি মানবসম্পদ উন্নয়নে। করোনার এই সময়েও কর্মীদের মানোন্নয়নের জন্য প্রচুর প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। আবার বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং পণ্য আনা হচ্ছে। বিশেষ করে অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশনে জোর দেওয়া হচ্ছে। কোনো গ্রাহক ব্যাংকে না এসে কলসেন্টার থেকে কীভাবে সেবা নিতে পারেন, বাসায় বসে যেন অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, বেতন অ্যাকাউন্টের বিপরীতে একটি ঋণের জন্য যেন শাখায় আসতে না হয়- এভাবে নানা উদ্ভাবন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। হোলসেল, রিটেইল, এসএমই সবই প্রচলিত ব্যাংকিং। এর পাশাপাশি নতুন রাস্তা বের করার চেষ্টা করছি আমরা। অন্য ব্যাংক এখনও সেভাবে কাজ করেনি এমন নতুন রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।

সমকাল :আগামীতে আপনাদের সেবায় কোন ধরনের ভিন্নতা থাকবে?

মাহবুবুর রহমান :ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আরও অনেক ব্যাংক কাজ করছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে আরও উদ্ভাবনের মাধ্যমে গ্রাহকদের ভালো ও সর্বোত্তম সেবা দেওয়া যায়। সশরীরে ব্যাংকে না গিয়ে মানুষ কীভাবে ডিজিটাল সেবা পেতে পারেন তা নিশ্চিত করা আমাদের লক্ষ্য। এ জন্য শাখার পরিধি সেভাবে না বাড়িয়ে এজেন্ট ব্যাংকিং, উপশাখা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল সল্যুশনের মাধ্যমে গ্রাহকসেবা দেওয়া হবে। প্রচলিত ধারায় এসএমই ঋণ বিতরণ বা তদারকির জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টা চলছে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা এবং টেলিকম সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কীভাবে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া যায় সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।

সমকাল :সব ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়ায় ব্যাংকের মুনাফায় কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?

মাহবুবুর রহমান :করোনার প্রভাব শুরুর আগে ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের সুদহারের গড় ব্যবধান (স্প্রেড) ছিল ৪ শতাংশের ওপরে। এখন তা ২ শতাংশের ঘরে নেমেছে। আবার করোনার কারণে আমদানি ও রপ্তানি কমে যাওয়ায় নন-ফান্ডেড আয়ও কমেছে। অথচ আগে নেওয়া মেয়াদি আমানতে ব্যাংকগুলো সেভাবে সুদ কমাতে পারেনি। যে কারণে স্প্রেড এতটা কমেছে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোকে দক্ষতা, অটোমেশন ও প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। অ্যাকাউন্ট খোলার যত ধাপ আছে তা কমানো, ঋণ প্রস্তাব আরও কম সময়ে অনুমোদন, স্টেশনারি খরচ কমানোসহ নানাভাবে খরচ কমিয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার সশরীরে উপস্থিত ছাড়া এখন মিটিং বা প্রশিক্ষণের আয়োজন করা যাচ্ছে। এখানেও খরচ কমেছে।

সমকাল :করোনাভাইরাসের ক্ষতি পোষাতে প্রণোদনা বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা হচ্ছে ?

মাহবুবুর রহমান :বড় ঋণের সঙ্গে ছোট ঋণের একটা সম্পর্ক আছে। কেননা ছোটরা সাপ্লাই চেইনে থাকায় বড় প্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে না চললে ছোট প্রতিষ্ঠান চলবে না। ফলে শুরুতে বড়দের দেওয়া হয়েছে। এখন এসএমই, কৃষিসহ অন্য ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। তবে অনেক সিএমএসএমই বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের স্টকলট হয়ে আছে। তাদের ঋণ বিতরণ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা দেখতে হবে। এর মধ্যে বন্যা হয়েছে। ফলে কৃষিঋণের চাহিদা সেভাবে নেই। তবে প্রণোদনার ঋণের পুরো ঝুঁকি ব্যাংকের ওপর। এখন ইউরোপে যেভাবে আবার করোনা চলে এসেছে, বাংলাদেশে যদি আসে সে ক্ষেত্রে একটা ঝুঁকি আছে। অন্যদিকে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ না করলেও খেলাপি করা হবে না। পরবর্তী সময়ে এক্ষেত্রে একটা সমস্যা আছে। ডিসেম্বরের পরে আবার পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল দরকার হতে পারে।

সমকাল :ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে। ব্যাংক খাতের ওপর এর প্রভাব কী?

মাহবুবুর রহমান :রেমিট্যান্স ব্যাপক বেড়েছে। আমানত যেভাবে বেড়েছে সে হারে ঋণ বিতরণ হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কেনায় বাজারে টাকা এসেছে। এসব কারণে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে। এরপরও কিছু ব্যাংক এখনও উচ্চ সুদ অফার করে অন্য ব্যাংক থেকে আমানত নিয়ে যাচ্ছে।

সমকাল :ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা হিসেবে বিবেচিত খেলাপি ঋণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে?

মাহবুবুর রহমান :করোনার কারণে সব কোম্পানি একইভাবে দাঁড়াতে পারবে না। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়বেই। আবার যেসব ঋণ পুনর্গঠন বা পুনঃতফসিল করা হয়েছে তাদের সবাই ঠিকমতো টাকা দিতে পারবে না। সুতরাং খেলাপি ঋণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে হবে।

সমকাল :এমটিবির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু বলবেন?

মাহবুবুর রহমান :নতুন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম আনা হচ্ছে। খুব শিগগিরই ইসলামী ব্যাংকিং শুরু করব। আবার কিছু কর্মীকে যে কোনো জায়গা থেকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। হয়তো প্রধান কার্যালয়ে আসতে পারেনি, কিন্তু একটি শাখা থেকে কাজ করতে পারবে। এভাবে পুরো কাজটাকে কেন্দ্রীয়করণের চেষ্টা করা হচ্ছে। শাখাকে শুধু রিটেইল ও সেবা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ফলে জায়গা কমিয়ে খরচ কমানো হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে।