খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায় সামান্য

নিয়মিত গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায়ও অনেক কমেছে

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২১

ওবায়দুল্লাহ রনি

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় ব্যাপক কমেছে। করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে নিয়মিত ও খেলাপিদের থেকে দুই লাখ ৬৩ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এর মানে ছয় মাসেই আদায় কমেছে ৮১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত গ্রাহকদের থেকে দুই লাখ ৬০ হাজার ৯০১ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ ক্ষেত্রে আদায় ছিল তিন লাখ ৩৫ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যেখানে ৯ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা আদায় হয়। অবশ্য করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পরই এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে যে পরিস্থিতি ছিল, তার তুলনায় জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে উন্নতি হয়েছে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে নিয়মিত গ্রাহকদের কাছ থেকে এক লাখ ৫২ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা ফেরত এসেছে। এর আগের প্রান্তিকে যা ছিল এক লাখ আট হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। একইভাবে খেলাপিদের থেকে ব্যাংকগুলো এক হাজার ৩৬২ কোটি টাকা আদায় করেছে। আগের প্রান্তিকে যেখানে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৯৯৬ কোটি টাকা।

ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন সমকালকে বলেন, যাদের ঋণ ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য আছে, করোনার দোহাই দিয়ে তাদের একটি অংশ ফেরত দিচ্ছেন না। অবশ্য কেউ কেউ প্রকৃতপক্ষে সমস্যায় পড়ে দিতে পারছেন না। যে কারণে আগের বছরের তুলনায় ঋণ আদায় কমেছে। এপ্রিল-জুনের পরিস্থিতি তুলনামূলক খারাপ থাকা স্বাভাবিক। কেননা, তখন বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। ফলে সে সময়ে খুব কম ঋণ ফেরত এসেছে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরু হয় গত বছরের মার্চে। এর প্রভাব মোকাবিলায় ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নমনীয় নীতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেউ ঋণ পরিশোধ না করলেও তাকে খেলাপি না করার নির্দেশনা জারি করা হয়, যার মেয়াদ ছিল গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে কেউ কিস্তি দিতে পারলে তাকে উৎসাহিত করেছেন ব্যাংকাররা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিলতার কারণে গত বছর খেলাপি ঋণ বাড়েনি। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমে গত সেপ্টেম্বর শেষে ৯৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকায় নামে, যা মোট ঋণের আট দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর মানে জুনের তুলনায় সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমেছে এক হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। আর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ২১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, শুধু ঋণ আদায় কমেছে তা নয়, ঋণ শোধের বাধ্যবাধকতা না থাকায় খুব একটা পুনঃতফসিলও হয়নি। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়কালে মাত্র দুই হাজার ৫৭৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত হয়েছে। আগের তিন মাসে নিয়মিত হয় দুই হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। যদিও আগের বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ১৫ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা এবং জুলাই-সেপ্টেম্বরে ৯ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়। পুনঃতফসিল কমার প্রভাবে সুদ মওকুফও কমেছে। করোনা-পরবর্তী এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে মাত্র ৫২৭ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করেছে ব্যাংকগুলো। আগের বছরের একই সময়ে যেখানে সুদ মওকুফ হয়েছিল ৪৯০ কোটি টাকা।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ হালিম চৌধুরী সমকালকে বলেন, এপ্রিল-জুন সময়ের বড় অংশজুড়ে অনেক কলকারখানা বন্ধ ছিল। যে কারণে ওই সময়ের তুলনায় জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আদায় বেড়েছে। তবে নীতি সহায়তার কারণে আগের বছরগুলোর তুলনায় ঋণ ফেরত কমেছে। শেষ প্রান্তিকেও আদায় আগের পর্যায়ে আসেনি। তিনি বলেন, সবাই ইচ্ছা করে ঋণের টাকা ফেরত দিচ্ছে না, তেমন নয়। অনেকে প্রকৃত খারাপ অবস্থার কারণে টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আবার কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন টাকা না দিলেও তো খেলাপি হবো না।

বেড়েছে অবলোপন :নীতি সহায়তার এ সময়ে অন্য ঋণ আদায় না বাড়লেও বেড়েছে অবলোপন। ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ভালো দেখাতে নির্দিষ্ট একটি সময় পর খেলাপি ঋণ অবলোপন করে আলাদাভাবে হিসাব করে। অবশ্য খেলাপি ঋণ অবলোপনের আগে ব্যাংকগুলোর মুনাফা থেকে শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হয়। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংকগুলোর দুই হাজার ৮৩ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন হয়েছে। আগের তিন মাসে অবলোপনের পরিমাণ ছিল ৯৯২ কোটি টাকা। আর ২০১৯ সালের পুরো সময়ে দুই হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন হয়েছিল। সব মিলিয়ে গত সেপ্টেম্বর শেষে অবলোপন করা ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ২৭২ কোটি টাকা।