করোনার কারণে অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে যেসব প্রভাব পড়েছে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে আরও দুই থেকে তিন বছর লেগে যাবে। ফলে আগামী বাজেটে এসব প্রভাব মোকাবিলায় জোর দিতে হবে। করোনার এ বিশেষ সময়ে দরকার সম্প্রসারণমূলক অর্থনীতি, যাতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করতে পারে বা প্রয়োজনীয় ব্যয় করতে পারে। পাশাপাশি দুর্নীতি বন্ধ ও সরকারি ব্যয়ের মান বাড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পদক্ষেপ নিতে হবে।

আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে গতকাল ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম বাংলাদেশ (আইবিএফবি) আয়োজিত অনলাইন আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। তারা বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে। আবার অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে। এরকম সময়ে ধারাবাহিকতা থেকে বের হয়ে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। যদিও বিশ্বজুড়ে সংকট চলছে। এরমধ্যে অবশ্য সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলো কাজে লাগাতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন, ব্যবসা পরিবেশ ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার দরকার। এছাড়া এগোনো সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, করোনার শঙ্কা এখনও রয়েছে। চলতি বাজেটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় 'অন্যরকম দারুণ' কিছু না থাকলেও মহামারি মোকাবিলায় সাহসী হয়েছে সরকার। বর্তমানে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রস্তুত হয়েছে। এতে নতুন বাজেট করা সরকারের জন্য সহজ হবে। এসব মাথায় রেখে আগামী বাজেটে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় উদ্যোগ থাকতে হবে। এক্ষেত্রে ঘাটতি বাড়লেও অসুবিধা হবে না। এক কথায় সম্প্রসারণমুখী বাজেট হতে হবে। একই সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়নে পর্যবেক্ষণও বাড়াতে হবে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, করোনার চেয়ে করোনার অভিঘাত দীর্ঘ হবে। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রভাব কাটাতে আরও দুই বা তিন বছর লাগবে। এজন্য সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতি দরকার। তিনি গুণগতমানের রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আরও বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ে ক্রয় ক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে বিনিয়োগ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। সরকারের সামাজিক ব্যয় এমন হতে হবে, যাতে ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যয় কমে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, এজন্য করের আওতা বাড়ানো দরকার। কর আহরণ, ব্যয় ও বিনিয়োগে ব্যাপক সংস্কার দরকার। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এ এতিম অবস্থার পরিবর্তন না হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ বলেন, করোনায় দেশে যতটা ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা হয়নি। বলা হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে করোনা নেই। কেন এমন হচ্ছে তা জানা নেই। তবে সামগ্রিকভাবে করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠছে সবাই। এখন এটাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। যারা সমস্যায় আছে তাদের সহায়তা দিতে হবে। স্বাস্থ্য অবকাঠামো বাড়ানোর পাশাপাশি দরিদ্রদের কাছে ঠিকমতো সুবিধা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

মূল প্রবন্ধে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেই মহামারি ও এর প্রভাব মোকাবিলা করা যাবে, তা নয়। বরাদ্দের যথাযথ বাস্তবায়ন দরকার। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। কালো টাকা সাদা করার বর্তমান সুযোগে দুর্নীতি উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, সময় শেষ হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে ব্যাংক খাতকে যথাযথ অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে। নতুবা অর্থনীতিতে করোনার চেয়ে বড় অভিঘাত পড়বে।

আলোচনা অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে আইবিএফবি সভাপতি হুমায়ুন রশিদ বলেন, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দরকার। এজন্য রাজস্ব ব্যবস্থা, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ঋণ বাজারে সংস্কার দরকার। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সংস্কারের বিকল্প নেই।

বিএসআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আলী হোসেন আকবর আলী বলেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে অন্যতম বাধা চলতি মূলধনের সংকট। এ সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে কর কমানো দরকার। আগাম কর সময়মতো ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে। আরও বক্তব্য দেন আইবিএফবির সাবেক সভাপতি হাফিজুর রহমান খান, সহসভাপতি এমএস সিদ্দিকী, পরিচালক মতিউর রহমান ও এম শোয়েব চৌধুরী। সংগঠনের সহসভাপতি লুৎফুন্নিসা সৌদিয়া খান সবাইকে ধন্যবাদ দেন।

মন্তব্য করুন