ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ দেওয়া আলাদা ইউনিট তথা অফশোর ব্যাংকিংয়ের ঋণ কমেছে। গত ডিসেম্বর শেষে অফশোর ব্যাংকিংয়ের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৩ কোটি টাকায়। গত জুন শেষে যা ছিল ৬৩ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। এর মানে ৬ মাসে ঋণস্থিতি কমেছে ৬৪৫ কোটি টাকা বা এক শতাংশের সামান্য বেশি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অবশ্য ঋণ ছিল ৬০ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। স্থিতি কমলেও খেলাপি ঋণ আগের মতোই ৪৫২ কোটি টাকা রয়েছে। মূলত আমদানি কমে যাওয়া এবং অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রম নীতিমালার আওতায় আসায় ঋণ কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।

দেশের বাইরে থেকে তহবিল সংগ্রহ করে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের মাঝে বিতরণের জন্য ১৯৮৫ সাল থেকে বাংলাদেশে অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমের অনুমোদন দেওয়া হয়। আগে নীতিমালা ছাড়াই ব্যাংকগুলো নিজেদের মতো করে এর কার্যক্রম চালাতো। তবে ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো অফশোর ব্যাংকিং পরিচালনার নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালার আলোকে সাধারণ ব্যাংকিংয়ের মতো অফশোর ইউনিট থেকে বিতরণ করা ঋণের বিপরীতেও সিআরআর, এসএলআর সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিধান পরিপালন করতে হয়। অবশ্য ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের খুব সামান্য অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় বিতরণ হয়। দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে বর্তমানে অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমে আছে ৩৬টি। এসব ব্যাংক যে ঋণ দেয় তার উল্লেখযোগ্য অংশ দেওয়া হয় আমদানি বিল ডিসকাউন্টিংয়ের বিপরীতে। তবে চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ কমেছে। এর আগে গত অর্থবছর কমেছিল ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, অফশোর ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের রেকর্ড খুব ভালো। এখানে খেলাপি ঋণও খুব কম। যে কারণে করোনার এ সময়েও তারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেছেন। তবে আমদানি কমাসহ বিভিন্ন কারণে অফশোর ব্যাংকিংয়ের ঋণ চাহিদা হয়তো কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, করোনার এ সময়েও মূল ব্যাংকিংয়ে ঋণ বাড়লেও অফশোর ব্যাংকিংয়ে সে অবস্থা নেই। এক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণস্থিতি কমে ৩৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকায় নেমেছে। গত জুন শেষে যা ছিল ৩৪ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। যদিও আগের মতোই বেসরকারি খাতের চারটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে ৪৪৫ কোটি টাকা। এই খেলাপি ঋণের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০৯ কোটি টাকা রয়েছে এবি ব্যাংকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১০২ কোটি টাকা রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকে। ঢাকা ব্যাংকে রয়েছে ১০ কোটি টাকা এবং প্রাইম ব্যাংকে রয়েছে ৮ কোটি টাকা। বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণস্থিতি ২৭ হাজার ৫৬৭ কোটি থেকে ২৩ হাজার ২১৯ কোটি টাকায় নেমেছে। এ খাতের একমাত্র উরী ব্যাংকে ৬ কোটি ৯ লাখ টাকা খেলাপি রয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার একমাত্র অগ্রণী ব্যাংকের ঋণস্থিতি এক হাজার ৪২০ কোটি থেকে এক হাজার ৩৫২ কোটি টাকায় নেমেছে। তবে ব্যাংকটিতে কোনো খেলাপি ঋণ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, অফশোর ব্যাংকিং থেকে বিতরণ করা ঋণের একটি অংশ আমদানি বিল ডিসকাউন্টিংয়ের বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে। গত অর্থবছরে দেশে আমদানি কমেছিল। চলতি অর্থবছরও আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে অফশোর ব্যাংকিংয়ের ঋণস্থিতি কমে থাকতে পারে।

করোনাভাইরাসের প্রভাবের কারণে ২০২০ সালে কেউ ঋণ পরিশোধ না করলেও তাকে খেলাপি করেনি ব্যাংকগুলো। এর আগে মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলসহ নানা সুবিধা দেওয়া হয়। যে কারণে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে খেলাপি ঋণ ব্যাপক কমেছে। গত ডিসেম্বর শেষে অভ্যন্তরীণ উৎসে ঋণস্থিতি বেড়ে ১০ লাখ ৯৫ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা হয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৮৮ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা বা ৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। গত জুন শেষে ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে খেলাপি ছিল ৯৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে ১০ লাখ ১১ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।

মন্তব্য করুন