মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান এবং জরুরি অবস্থা জারি করায় সে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ কষছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। যাদের এরই মধ্যে বিনিয়োগ আছে এবং বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছেন, তাদের একটি অংশ অন্য দেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশের এ ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা যায়, মিয়ানমারে চীন, সিঙ্গাপুর, জাপান, হংকং ও যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ বেশি। দেশটিতে কোরিয়ার কিছু উদ্যোক্তা বড় বিনিয়োগ করার পরিকল্পনার মধ্যে ছিলেন। কিন্তু বর্তমান অস্থিরতায় তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের চিন্তাভাবনা করছেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে বাংলাদেশে আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল করার আগ্রহ দেখিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। তবে এ নিয়ে আলোচনা তেমন গতি পায়নি।

কিন্তু এবার মিয়ানমারের অস্থিরতা শুরুর পর সে দেশের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অন্যদিকে, চীন ও জাপানের জন্য আলাদা দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। ওই দু'দেশের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ

প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। সিঙ্গাপুর, হংকং ও যুক্তরাজ্যের উদ্যোক্তারা নতুন নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আসছেন।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, চীন থেকে জাপানের বিনিয়োগ বাংলাদেশের আনার বিষয়ে এরই মধ্যে সরকারি পর্যায়ে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। একইভাবে মিয়ানমার থেকে বিদেশি বিনিয়োগ স্থানান্তর হলে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি হবে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে এ বিষয়ে আরও অগ্রগতি হবে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ আছে। বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানের বিনিয়োগ স্থানান্তর হওয়ার ধারণা করা হচ্ছে। এসব বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিমালার পরিবর্তন দরকার। বিশেষ করে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে করপোরেট করসহ অন্যান্য সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগের অফার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বড় মুশকিল হলো, দেশের করপোরেট করহার অনেক বেশি। করপোরেট কর কমালে তা বিনিয়োগবান্ধব হবে। তিনি মনে করেন, অস্থিরতার কারণে শ্রীলঙ্কা থেকে এক সময় পোশাক খাতের বিনিয়োগ বাংলাদেশে এসেছে। একইভাবে চীন ও মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্থানান্তর করতে পারেন।\হগবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান সমকালকে বলেন, সামগ্রিকভাবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সাফল্য কম বাংলাদেশের। পরিস্থিতির উন্নতি করতে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সামগ্রিকভাবে অবকাঠামো সমস্যা দীর্ঘদিনের। এটা ধারণা করা যায়, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধে ও মিয়ানমারের অস্থিরতায় বিনিয়োগ স্থানান্তর হতে পারে। এসব বিদেশি বিনিয়োগ ধরতে বাংলাদেশকে হোমওয়ার্ক করতে হবে। দ্রুত ই-জেড প্রস্তুত করতে হবে। ব্যবসার খরচ কমাতে হবে। বিশেষ করে কর কাঠামো প্রতিযোগী দেশের চেয়ে কমানো উচিত। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ নীতিমালা করতে হবে। অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান হওয়া জরুরি।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রহমান সমকালকে বলেন, মিয়ানমারে করপোরেট কর ২০ শতাংশ। বাংলাদেশে ৩২ শতাংশের বেশি। এ কারণে মিয়ানমার থেকে এ দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আনা কঠিন হবে। মিয়ানমারের প্রতিযোগী অনেক দেশে কর কম আছে। বিদেশি বিনিয়োগ টানতে প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিলে তা বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিদেশিরা স্থানীয় পর্যায়ের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেই ওই দেশে বিনিয়োগে আসেন। দেশীয় উদ্যোক্তাদের কর সুবিধা বাড়ালে সব দিক দিয়ে লাভবান হবে দেশ। দীর্ঘমেয়াদে দেশের লাভের পরিকল্পনায় এখনই কর ও শুল্ক্ক কাঠামো বিনিয়োগবান্ধব করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, মিয়ানমারে থাকা বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ আনতে চাইলে ওই দেশের চেয়ে বেশি সুবিধা দিতে হবে।

সম্প্রতি ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের এক ওয়েবিনারে এমসিসিআইর সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, করোনার কারণে সারাবিশ্বে এফডিআইর হার অর্ধেক হয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ আছে। মিয়ানমার থেকে অনেক দেশ অন্যত্র বিনিয়োগ নিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমার থেকে ব্যবসা ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ এখনই। আর এজন্য কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন