করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্তি নিরুৎসাহিত করছে সরকার। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চিঠি দিয়ে আগামী অর্থবছরের এডিপি সাজানোর ক্ষেত্রে এমন পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন এবং সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠিত সভায় আগামী এডিপিতে নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্তিকে নিরুৎসাহিত করার এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে তা বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদিত ব্যয়সীমার মধ্যে থাকে।

করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীর গতি থাকায় রাজস্ব আহরণ কম হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকার অগ্রাধিকার ও জরুরি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাইরে অন্যান্য খাতে ব্যয় করতে চাচ্ছে না। এ জন্য এডিপিতে নতুন প্রকল্প নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে যেসব প্রকল্প জরুরি সেগুলো অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সরকার চাচ্ছে চলমান অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোকে ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে। পাশাপাশি বৈদেশিক সহায়তা ও ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন বাড়াতে।

উল্লেখ্য, পরিস্থিতি বিবেচনায় চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যয় সাশ্রয়ী নীতি নেয় সরকার। এডিপিতে থাকা কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ ছাড় বন্ধ রাখা হয়েছে। মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলোকে তাদের এডিপি বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ ব্যয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেটের আওতায় গাড়ি কেনা, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ রেখেছে সরকার। সর্বশেষ পূর্ত কাজের চুক্তি সম্পাদন নোটিশ প্রদান স্থগিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এডিপির আকার প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা কমানো হচ্ছে। মূল বাজেটে এডিপিতে ব্যয়ের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। যা সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে বাজেট ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর এডিপির মোট বরাদ্দ বা ব্যয়সীমা নির্ধারণ করেছে। কমিটির নির্ধারণ করা ব্যয়সীমাই সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং এটি আর বাড়ানো হবে না। আগামী অর্থবছরের জন্য মোট দুই লাখ ২৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকার এডিপি প্রাক্কলন করা হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয়গুলো প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়সীমা নির্ধারণ করবে।

আগামী অর্থবছরে কোনো মন্ত্রণালয়ের ব্যয়সীমার মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে বাজেট ওয়ার্কিং গ্রুপের কাছে প্রকল্পের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের জন্য পাঠাতে হবে। সে ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম অগ্রাধিকারের প্রকল্প বাদ অথবা বরাদ্দ কমিয়ে উচ্চ অগ্রাধিকার প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান করতে হবে। তবে বাজেট ওয়ার্কিং গ্রুপের সুপারিশ পর্যালোচনা করে বাজেট ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। আগামী ৯ মের মধ্যে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রাক্কলন এবং ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রক্ষেপণ পাঠাতে বলেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

সরকারের এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, আগামী অর্থবছরের এডিপিতে নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। কারণ বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে জনসাধারণের স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা রাখা, আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডে বেশি ব্যয় করতে হবে। সে জন্য চলমান প্রকল্পগুলো যথাসময়ে শেষ করা জরুরি। চলমান প্রকল্প সময়মতো শেষ না হলে ব্যয় বেড়ে যাবে। তবে যেসব প্রকল্প জরুরি সেগুলোকে এডিপির আওতায় নিতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে অননুমোদিত প্রকল্পে বরাদ্দ প্রস্তাব করা যাবে না। তবে পরের দুই অর্থবছরের জন্য প্রক্রিয়াধীন প্রকল্প বা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ দেখানো যাবে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ২০২১-২২ অর্থছরের প্রকল্পওয়ারি বরাদ্দের ক্ষেত্রে মোট এডিপির বরাদ্দের অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রস্তাব করতে পারবে না। এমনকি অনুমোদিত প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো যাবে না। তবে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত প্রকল্প এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। সরকারের কৌশলগত উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়ক হয় এমন সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমে অর্থ বরাদ্দ করা হবে। সাধারণভাবে বাজেটে কোনো প্রকার থোক বরাদ্দ থাকবে না। নতুন প্রকল্প নিরুৎসাহিত করা হলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চলমান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে, যাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি ঠিক থাকে। বরাদ্দের সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম ব্যবহার করে, সে বিষয়ে উদ্যোগ থাকবে বাজেটে।

মন্তব্য করুন