দেশের সবচেয়ে ভালো আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত আইডিএলসি ফাইন্যান্সে মেয়াদি আমানত রেখে ৪ থেকে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদ মিলছে। দ্বিগুণ ও তিনগুণ সুবিধার আমানত স্কিমে পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদ। 'প্যারা মিনিমাম বেনিফিট ম্যাক্সিমাম' এ রকম প্রচারণায় আমানত সংগ্রহ করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফাইন্যান্স মেয়াদি আমানতে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। আর বিশেষ স্কিম ভেদে সুদ পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ৮ শতাংশ পর্যন্ত। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এভাবে আমানতে সুদ কমানোয় এ খাতের তহবিল ব্যয় কমে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে তহবিল ব্যবস্থাপনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গড়ে খরচ হয়েছে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগের মাস এপ্রিলে যা ছিল ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আর গত বছরের একই মাসে ছিল ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কম সুদে পাওয়া পুনঃঅর্থায়ন, বিদেশি সংস্থার তহবিলসহ এ হিসাব প্রকাশ হয়। তবে সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের তহবিল পায় না। যে কারণে কম সুদের তহবিল বাদে সমন্বিত তহবিল ব্যবস্থাপনা খরচের আরেকটি হিসাব প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত মে মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের সমন্বিত তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমেছে। আগের মাস এপ্রিলে যা ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ ছিল। আর আগের বছরের একই মাসে ছিল ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিল থেকে ব্যাংক ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়ার পর থেকে তহবিল ব্যয় এভাবে কমছে।

ব্যাংকগুলো এখন সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে মেয়াদি আমানত নিচ্ছে। সঞ্চয়ী হিসাব, স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিটসহ (এসএনডি) অন্যান্য আমানতে সুদ মিলছে ১ থেকে ৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে গত মে মাসে ব্যাংক আমানতের গড় সুদহার নেমেছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মেয়াদি ছাড়া অন্য কোনো আমানত নিতে পারে না। আবার এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি কম থাকা এবং সাম্প্রতিক চরম আস্থাহীনতার কারণে গড় সুদ সব সময় বেশি থাকে। গত এপ্রিলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতের গড় সুদহার কমে ৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশে নেমেছে। একইভাবে ঋণের সুদ নেমেছে ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশে। আগের মাস মার্চে আমানতে ৮ দশমিক ১৬ এবং ঋণে ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ সুদ ছিল। আর আগের বছরের একই মাসে আমানতে ১০ দশমিক শূন্য ৪ এবং ঋণে ১৩ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ সুদ ছিল।

সংশ্নিষ্টরা জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের তহবিলের বড় অংশই আসে ব্যাংক থেকে। গত বছরের এপ্রিলের আগে ব্যাংকগুলো এসব প্রতিষ্ঠানে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদে তহবিল জোগান দিত। বর্তমানে ৯ শতাংশের কম সুদে তহবিল দিচ্ছে। পাশাপাশি ভালো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক পর্যায়ে আমানতের সুদহার অনেক কমিয়েছে। যে কারণে গড় তহবিল খরচ এভাবে কমেছে। অবশ্য খারাপ অবস্থায় থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানত নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে উচ্চ সুদে আমানত পাওয়ার জন্য কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান মোবাইলে এসএমএস পাঠাচ্ছে। তবে ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে সেখানে টাকা রাখতে অনীহা দেখাচ্ছেন গ্রাহকরা। ফলে উচ্চ সুদের প্রলোভনের পরও সামগ্রিকভাবে এ খাতের আমানত কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে গত মার্চ পর্যন্ত গ্রাহক আমানতের পরিমাণ কমে ৪৪ হাজার ২৩৩ কোটি টাকায় নেমেছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা ছিল। বেশ আগ থেকে নানা দুরবস্থার মধ্যে চলছে এ খাত। আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে না পারার ব্যাপক অভিযোগের মধ্যে ২০১৯ সালে পিপলস লিজিং অবসায়নের উদ্যোগের পর এ খাতের দুরবস্থা সামনে আসে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে দুদক তদন্ত শুরু করার পর এ খাতের খারাপ অবস্থা সবার সামনে আরও পরিস্কার হয়। অবশ্য এ খাতের দুর্দশা কাটাতে উচ্চ আদালত ও বিএসইসি থেকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে।\হসার্বিক বিষয়ে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতির প্রভাবে পুরো খাত খারাপ অবস্থায় পড়েছে। ফলে অবস্থার উন্নয়নে শুধু প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করলেই চলবে না। আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে।

মন্তব্য করুন