চলতি অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর জন্য ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নতুন নীতিমালা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংকগুলো বিতরণ করবে ১১ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলো দেবে ১৭ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা এবং কয়েকটি নতুন খাত যুক্ত করে ২০২১-২২ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

চলতি অর্থবছরের কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের ২৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকার তুলনায় ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছর ব্যাংকগুলো ২৫ হাজার ৫১১ কোটি টাকা বিতরণ করেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এর বাইরে করোনা মোকাবিলায় কৃষি খাতের বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে বিতরণ করা হয়েছে আরও চার হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত অর্থবছর কৃষি খাতে মোট ২৯ হাজার ৮০৬ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ হাজার ১২৪ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর মধ্যে বিতরণ হয় ২২ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা, যা ৯৪ দশমিক ৩০ শতাংশ।

সংশ্নিষ্টরা জানান, করোনা সংক্রমণের এ সময়ে যেন ঋণ বিতরণ না কমে, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব সময় সক্রিয় ছিল। ব্যাংকারদের নিয়ে মাসিক ও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বৈঠক করা হয়েছে। ঋণ বিতরণ বাড়াতে ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি শাখা ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগের নিবিড় তদারকি ও ব্যাংকগুলোর আন্তরিকতার ফলে কৃষি খাতে এত ঋণ বিতরণ সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবজনিত মহামারির কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট মোকাবিলায় কৃষি ঋণ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের টেকসই উন্নয়নে প্রধান তিনটি লক্ষ্য তথা দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা মুক্তি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে পল্লি অঞ্চলে পর্যাপ্ত কৃষি ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নতুন নীতিমালা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। গত অর্থবছর মোট ৩০ লাখ ৫৫ হাজার ব্যক্তিকে কৃষি ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ লাখ ৬ হাজার নারী কৃষক পেয়েছেন প্রায় ৯ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। ২২ লাখ ৪৬ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১৭ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছেন। চর, হাওর প্রভৃতি অনগ্রসর এলাকার সাত হাজার ৭৯৬ কৃষক পেয়েছেন ৩৪ কোটি টাকা।

নীতিমালায় ঋণের তদারকি অধিকতর জোরদার করতে বলা হয়েছে। আর পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলে জনসাধারণের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতের ক্ষেত্রে সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং কৃষকদের কাছে কৃষি ঋণ সহজ করতে বর্তমান নীতিমালা ও কর্মসূচিতে বেশ কিছু সময়োপযোগী বিষয় সংযোজন করা হয়েছে। নীতিমালায় প্রাণিসম্পদের পোলট্রি উপখাতের আওতায় সোনালি মুরগি, মহিষ ও গারল পালনে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। ফসলভিত্তিক ঋণ নিয়মাচারে একরপ্রতি ঋণসীমা কৃষকদের প্রকৃত চাহিদা ও বাস্তবতার নিরিখে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। মৎস্য চাষে একরপ্রতি ঋণ সীমা বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের আলোকে ইতোমধ্যে কার্যকর হওয়া কৃষি ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ করার বিষয়টি নীতিমালায় যুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নিয়মিত ঋণের পাশাপাশি করোনাভাইরাসের কারণে সরকারের সুদ ভর্তুকির আওতায়ও যথেষ্ট ঋণ বিতরণ হয়েছে। মৌসুমভিত্তিক ফুল, ফল, মৎস্য চাষ, পোলট্রি, ডেইরি ও প্রাণিসম্পদ খাতে চলতি মূলধন সরবরাহের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়। এর আওতায় ব্যাংকগুলো চার হাজার ২৯৫ কোটি টাকা বিতরণ করেছে, যা তহবিলের ৮৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে শস্য ও ফসল খাতে ৪ শতাংশ সুদে চার হাজার ৮৮১ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। কম সুদের এ দুই কর্মসূচির মেয়াদ গত জুনে শেষ হয়েছে।

মন্তব্য করুন