বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। নতুন মুদ্রানীতি কেমন হলো, প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের ব্যবহার এবং মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের ওপর সমকালের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ আবদুল্লাহ

সমকাল: বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিকে সম্প্রসারণমূলক ও সংকুলানমুখী বলেছে। মুদ্রানীতির এ ভঙ্গিকে আপনি কীভাবে দেখছেন ?

সালেহ উদ্দিন আহমেদ: এবারের মুদ্রানীতিকে গতবারের ধারাবাহিকতাই বলতে হবে। আশা করেছিলাম, করোনার প্রভাব মোকাবিলার জন্য নতুন কিছু থাকবে। তেমন কিছু দেখা গেল না। চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। গতবারও এরকমই ছিল। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও সক্রিয় নীতি দরকার ছিল। পলিসি রেট (নীতি সুদহার) পরিবর্তন করা হয়নি। ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা অতিরিক্ত তারল্য তাহলে কী করবে? খেলাপি ঋণসহ ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানে কোনো নির্দেশনাও নেই। এছাড়া ভেঞ্চার ক্যাপিটালের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে পরিস্কার নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে পুনঃঅর্থায়নের উদ্যোগ নিতে পারত। ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল। মোদ্দা কথা, মুদ্রানীতি বাস্তবসম্মত হয়নি।

সমকাল: ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য বাজারে পণ্য ও সম্পদের মূল্য বাড়াতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, যদি তেমন হয় তাহলে যথাযথ নীতি নেবে। সেই নীতি কেমন হওয়া উচিত?

সালেহ উদ্দিন আহমেদ: ব্যাংকগুলো তেমন ঋণ বিতরণ করছে না। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের হাতে টাকা না গেলে চাহিদা বাড়বে না। ব্যবসাতো শুধু খাদ্য আর ওষুধ নয়। এ দুটোর বাইরে অনেক বিষয় রয়েছে। ফলে মূল্যস্ম্ফীতিতে বিশেষ প্রভাব পড়বে না। আর মূল্যস্ম্ফীতি যদি কিছুটা বাড়েও তাতে সমস্যা নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ে মাতামাতি করার দরকার নেই। আইএমএফ চায় মূল্যস্ম্ফীতি কম রাখতে। এখন মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের আয় এবং ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানো। বিভিন্ন সেবা খাতকে গতিশীল করা। এর ফলে মূল্যস্ম্ফীতি বাড়লে বাড়ূক। তাতে অসুবিধা হবে না।

সমকাল: প্রণোদনার ঋণের একটি অংশ শেয়ারবাজার ও অনুৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানতে পেরেছে। এজন্য ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্ক হতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

সালেহ উদ্দিন আহমেদ: অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্রণোদনার ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা আগেই দেখা দরকার ছিল। ব্যাংকগুলো ছোট প্রতিষ্ঠানকে তেমন ঋণ দেয়নি। দিয়েছে বড় প্রতিষ্ঠানকে। কাউকে কাউকে প্রয়োজনের বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে। এরকম মহামারির মধ্যে অতিরিক্ত টাকা যারা পেয়েছে তারা কী করবে? যারা প্রণোদনার টাকা নিয়ে শেয়ারবাজার বা অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগে করেছে, এখন তাদের খুঁজে বের করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢালাও নোটিশ দিয়ে হবে না।

সমকাল: চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ আর মূল্যস্ম্ফীতি ৫ দশমিক ৩ শতাংশে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। করোনার এই সময়ে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে?

সালেহ উদ্দিন আহমেদ: গেল অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ বলা হচ্ছে। আমার মনে হয় না, এই হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কারণ, একমাত্র কৃষি খাত ছাড়া অন্য সব খাত সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য খাতে সমস্যা ছিল। প্রাণী ও মৎস্যসম্পদ, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাত এবং ছোট ও মাঝারিশিল্পের উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে কর্মসংস্থান হয়। আর চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা, তা অর্জন সম্ভব নয়।

সমকাল: মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে আপনার পরামর্শ কী? অন্তর্বর্তীকালীন কোনো পর্যালোচনার দরকার আছে বলে মনে করেন?

সালেহ উদ্দিন আহমেদ: মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করবে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজার। এসব ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের অভাব এখন বড় সমস্যা। এসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। আর পর্যালোচনা বিষয়ে বলব, বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরদিকে মুদ্রানীতি এক বছর মেয়াদে করাই ঠিক নয়। ছয় মাস মেয়াদে করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছর মেয়াদে করে পরে সার্কুলার, গাইডলাইন ইত্যাদি করছে। এতে বাস্তবায়নে জটিলতা হয়।

মন্তব্য করুন