আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করছে, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের 'ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক' প্রতিবেদনে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে এমন পূর্বাভাস রয়েছে। সংস্থাটি মনে করছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধার হচ্ছে, তবে এর গতি দুর্বল হয়ে গেছে। এর প্রধান কারণ, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে বিভিন্ন দেশে নতুন করে করোনার 'ডেলটা ধরন'-এর সংক্রমণ এবং উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে প্রত্যাশিত টিকাদান না হওয়া।

বাংলাদেশের জিডিপি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের চেয়ে বেশি। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে গত অর্থবছরে (২০২০-২১) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের।

কোনো দেশের জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা জিডিপির হিসাব করে। বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার এ হিসাব করার সক্ষমতা নেই। তারা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের গতিপ্রকৃতি দেখে পূর্বাভাস দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাধারণত এসব সংস্থার পূর্বাভাসের চেয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেশি হয়ে থাকে।

আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে এর সদস্য ১৮৮টি দেশের অর্থনীতি কেমন যাবে, তা নিয়ে ২০২১ ও ২০২২ সালের প্রক্ষেপণ রয়েছে। বাংলাদেশসহ কিছু দেশের ক্ষেত্রে প্রক্ষেপণ অর্থবছরের ওপর। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা চলাকালীন আইএমএফ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করল। গতকাল এ প্রতিবেদনের ওপর সংবাদ সম্মেলন করেছেন আইএমএফের কর্মকর্তারা। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিয়ে আলাদা কোনো বিশ্নেষণ নেই। শুধু দেশওয়ারি ছকে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ম্ফীতি ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নিয়ে প্রক্ষেপণ রয়েছে।

আইএমএফের মতে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ম্ফীতি বাড়বে। গত অর্থবছরে গড় মূল্যস্ম্ফীতি ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এবার তা বেড়ে দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী আগামীতে মূল্যস্ম্ফীতি বাড়তে পারে। সংস্থাটি মনে করছে, বৈদেশিক লেনদেনে বাংলাদেশের চলতি হিসাবে ঘাটতি থাকবে। চলতি হিসাবে গত অর্থবছরে ঘাটতি ছিল জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা ১ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতি :আইএমএফের ধারণা, ২০২১ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, যা তাদের আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। ২০২২ সালে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, যা সংস্থার আগের পূর্বাভাসের সমান।

আইএমএফ বলেছে, করোনাভাইরাসের ডেলটা ধরনের উচ্চ সংক্রমণের কারণে বিশ্বে মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫০ লাখ হয়েছে। এর স্বাস্থ্যঝুঁকি ব্যাপক এবং অর্থনীতি স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় বাধা। ডেলটার পরের ঝুঁকি হলো, সারস-কভিড-২ নামে নতুন ধরন, যা হাজির হলে অনেক মানুষকে টিকা দেওয়ার পরও এর সংক্রমণ আটকানো যাবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে প্রধান বিচ্যুতি রেখা হলো- সবার জন্য টিকার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারা। যদিও অনেক উন্নত দেশে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় অগ্রগতি হয়েছে। অধিক অগ্রসর দেশগুলোতে গড়ে ৫৮ শতাংশ মানুষ টিকা পেয়েছে। উন্নয়নশীল এবং উদীয়মান দেশগুলোতে এ হার ৩৬ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়- নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ৫ শতাংশেরও কম মানুষ টিকা পেয়েছে।

মূল্যস্ম্ফীতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং উদীয়মান কিছু বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অতিমারিজনিত চাহিদা ও সরবরাহের অসামঞ্জস্য এর মূল কারণ। আগামীতে মূল্যস্ম্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকবে। প্রতিবেদনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য বিশ্বসম্প্রদায়কে টিকাদানের গতি বাড়াতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। আইএমএফ ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বের অন্তত ৪০ এবং ২০২২ সালের জুনের মধ্যে অন্তত ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার সুপারিশ করেছে।

মন্তব্য করুন