শেয়ারবাজার তালিকাভুক্ত কোনো বীমা কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৬০ শতাংশ শেয়ার না থাকলে তারা শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠান সিডিবিএলকে এ বিষয়ে যে চিঠি দিয়েছে, তাতে এ নিষেধাজ্ঞা তৈরি হয়েছে। তবে বিএসইসির এমন চিঠির আইনি বৈধতা ও এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বীমা কোম্পানির যে আইন বলে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজিব-উল আলম। তিনি সমকালকে বলেন, বীমা আইনে শুধু উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু উদ্যোক্তারা কারা, তার সংজ্ঞা নেই। আবার উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণে শর্ত আরোপ করা হলেও তা সাধারণ শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের ওপরও প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

গত ৪ অক্টোবর বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর এক চিঠির বরাত দিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ এবং সিডিবিএলকে পাঠানো এক চিঠিতে বিএসইসি বলেছে, বীমা কোম্পানি আইন ২০১০ এর ২১(৩) ধারা অনুযায়ী বীমা কোম্পানির উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের ৬০ শতাংশ শেয়ার থাকতে হবে। এ অবস্থায় কোনো বীমা কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা শেয়ার বিক্রি করতে চাইলে আইনি এ ধারা পরিপালন সাপেক্ষে যেন তা কার্যকর করা হয়।

ডিএসই প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) সাইফুর রহমান মজুমদার সমকালকে বলেন, ওই চিঠি অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোনো বীমা কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ৬০ শতাংশ শেয়ার না থাকলে কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হবে না। বীমা আইনে শুধু উদ্যোক্তাদের ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু সব পরিচালকের শেয়ারও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আইনি বৈধতা আছে কিনা, জানতে চাইলে ডিএসইর সিওও বলেন, এ ব্যাখ্যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি দিতে পারবে। স্টক এক্সচেঞ্জ শুধু বিএসইসির আদেশ পরিপালন করবে।

সাধারণ শেয়ারহোল্ডার থেকে কেউ পরিচালক হলে, তাকে কোন আইনি ক্ষমতা বলে শেয়ার বিক্রি করতে বাধা দেওয়া হবে- জানতে চাইলে বিএসইসির কমিশনার শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, 'বীমা আইনে উদ্যোক্তা বলা হলেও সম্ভবত তা উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বোঝানো হয়েছে।' আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট আইনের শব্দগত অর্থের বাইরে অন্য কোনো অর্থ ধারণা থেকে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ আছে কিনা, এমন প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর তিনি দেননি।

শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, আইডিআরএ চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, বীমা আইন অনুযায়ী বীমা কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ৬০ শতাংশ শেয়ার থাকতে হবে। বীমা কোম্পানিগুলো এ আইন পরিপালন করছে কি-না, তা দেখার দায়িত্ব বিএসইসির নয়, আইডিআরএর।

ব্যারিস্টার তানজিব-উল আলম আরও বলেন, বীমা আইনের সংশ্নিষ্ট ধারা যে ত্রুটিপূর্ণ, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জানার কথা। এ অবস্থায় আইনটিকে যথাযথভাবে সংশোধনের চেষ্টা না করে তার প্রয়োগ উদ্দেশ্যমূলক হতে পারে। প্রথমত, বীমা আইনে উদ্যোক্তাদের ৬০ শতাংশ শেয়ার থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু কারা উদ্যোক্তা, তার কোনো সংজ্ঞাই নেই। ফলে বীমা কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের যে কেউ এ আইনের বলে তাদের শেয়ার বিক্রিতে বাধা দিলে তারা তা চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন।

তাছাড়া এ আইন পুরোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন অসম্ভব বলেও মন্তব্য করেছেন ব্যারিস্টার তানজিব-উল আলম। তিনি বলেন, বিএসইসির পাবলিক ইস্যু রুলস ২০১৫ অনুযায়ী, উদ্যোক্তা কেবল তারাই, যারা কোম্পানি গঠনের সময়ে সংঘ স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। এ সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো উদ্যোক্তা মারা গেলে তার উত্তরাধিকার ওই শেয়ারের মালিক হবেন, কিন্তু উদ্যোক্তা হিসেবে বিবেচিত হবেন না।

সম্প্রতি এ বিষয়ে সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আইডিআরএর চেয়ারম্যান ড. এম. মোশাররফ হোসেনও স্বীকার করেন, বীমা আইনের এ ধারা ত্রুটিপূর্ণ। শেয়ারবাজার সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বীমার শেয়ার নিয়ে কারসাজির একাধিক চক্র শেয়ারবাজারে সক্রিয়। আইনি এ ধারাকে ঢাল করে তারা শেয়ারদর বাড়িয়েছে। নতুন করে এ আইন প্রয়োগের উদ্যোগ কারসাজির অংশ হতে পারে। ২০১১ সালে বিএসইসি তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের শর্ত আরোপ করলে বীমার উদ্যোক্তা-পরিচালকরাই উচ্চ আদালতে গিয়ে তা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। বর্তমানে মাত্র চারটি কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ার ৬০ শতাংশের বেশি।

মন্তব্য করুন