মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও কমানোর প্রস্তাব করেছে দেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটি বলছে, ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া দরকার। প্রতিযোগী দেশগুলো ব্যাপকভাবে স্থানীয় মুদ্রার মান কমানোয় বৈশ্বিক বাজারে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত প্রতিযোগিতায় টিকতে হিমশিম খাচ্ছে। এই সংকটময় সময়ে বিনিময় হারে টাকার মান কমানো হলে তা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লেখা এক চিঠিতে এমন প্রস্তাব দিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান। তিনি বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মুদ্রার সঙ্গে মার্কিন ডলারের গত ১০ বছরের বিনিময় হার তুলে ধরে বলেছেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রার মান ডলারের বিপরীতে যতটা কমেছে, বাংলাদেশে ততটা কমেনি। এতে বৈশ্বিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। প্রসঙ্গত, দর হারালে রপ্তানিকারকরা প্রতি ডলারের বিপরীতে আরও বেশি টাকা পান। অন্যদিকে, ক্রেতাদেরও একই পণ্য কিনতে তুলনামূলক কম খরচ করতে হয়। ফলে পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় বিনিময় হার প্রভাব ফেলে।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মুদ্রার বিনিময় হারের সঙ্গে শুধু রপ্তানি খাত সম্পৃক্ত, তা নয়। এর সঙ্গে মূল্যস্ম্ফীতিসহ নানা বিষয় সম্পৃক্ত। ফলে সিদ্ধান্তটি হতে হবে সামগ্রিক প্রেক্ষিত বিবেচনায়। টাকার মান ১ শতাংশ কমানো হলে রপ্তানি কতটুকু বাড়বে, তা যেমন হিসাব করা দরকার, তেমনি আমদানি, মূল্যস্ম্ফীতি, স্থানীয় শিল্পের বিনিয়োগ, শেয়ার বাজারে বিদেশি বিনিয়োগসহ সার্বিক অর্থনীতিতে কতটুকু প্রভাব পড়বে, তাও বিবেচনা করতে হবে।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেছেন, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের টাকা ডলারের বিপরীতে ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ দর হারিয়েছে। ২০১৮ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে ৮২ টাকা ৮২ পয়সা পাওয়া যেত। বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে ৮৬ টাকা। এ সময়ে পাকিস্তানি রুপি ৫৯ দশমিক ৬০ শতাংশ, ভারতীয় রুপি ১৬ দশমিক ১৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কান রুপি ৫৮ এবং ভিয়েতনামের ডং মান হারিয়েছে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ। গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকা ১ দশমিক ৪২ শতাংশ দর হারিয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে এক ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। বর্তমানে তা বেড়ে ৮৬ টাকা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে টাকার মান ধীরে ধীরে কমছে।

চিঠিতে বলা হয়, তৈরি পোশাকের মূল্য বাড়েনি। কিন্তু কাঁচামাল, পরিবহন খরচ, জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে, প্রতিযোগী দেশগুলো ডলারের বিপরীতে তাদের মুদ্রার মান কমিয়েছে। দেশের শিল্পের স্বার্থে মুদ্রার বিনিময় হারে বৈশ্বিক পরিস্থিতি প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকা দর হারালে রপ্তানিকারকরা কিছু সুবিধা পাবেন। তবে আমদানি খরচও বাড়বে। কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, মেশিনারিজের মতো পণ্য আমদানিতে খরচ বেড়ে যাবে। এতে উৎপাদন খরচও বাড়বে। ফলে সবক্ষেত্রে সমন্বয় থাকাটা জরুরি। এটা ঠিক যে, অন্য যেসব দেশ পোশাক রপ্তানি করে সেখানকার স্থানীয় মুদ্রার মান ডলারের বিপরীতে অবমূল্যায়িত হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে রপ্তানি খাতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা রয়েছে। এর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং পণ্যের দর বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা যেতে পারে।

বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, সম্প্রতি ডলারের চাহিদা জোগানের ভারসাম্য সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে টাকার মান কিছুটা কমানো যেতে পারে। কিন্তু তা হতে হবে ধাপে ধাপে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। রাতারাতি টাকার মান অনেক কমিয়ে ফেলা হলে বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। এতে করে মূল্যস্ম্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হবে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজার যেভাবে ব্যবস্থাপনা করেছে, তাতে সমস্যা দেখা যাচ্ছে না। তবে এটা সত্য যে, ডলারের বিপরীতে টাকার প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হারের তুলনায় বর্তমান বাজারদর কম।

আর্থিক মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, টাকার বিনিময় হারে চাপ সৃষ্টি হওয়ার ফলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ম্ফীতির ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বাজারে ডলার বিক্রি করছে। ২০২১ সালের শুরু থেকে ওই বছরের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রি করেনি। গত বছর ১৯ আগস্ট প্রথম বিক্রি শুরু করে। সেই থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত ২৫৩ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মন্তব্য করুন