কোরবানির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

মানব-সভ্যতার ইতিহাসে কোরবানির তাৎপর্য অপরিসীম। বিশেষ করে ইসলামের ইতিহাসে কোরবানির ঘটনা ও তাৎপর্য মুসলমানিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এখানে কোরবানি মানে শুধু পবিত্র ও বরকতময় ঈদুল আজহা ও তার পরের দু'দিনে হালাল পশু জবেহকরণের মাধ্যমে এক ধরনের বিত্তকেন্দ্রিক মহড়া বা মাংস ভক্ষণের প্রতিযোগিতা নয়; বরং দুনিয়ার ইতিহাসে আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের সর্বোত্তম নমুনা পেশ করাই হচ্ছে কোরবানির আসল মাহাত্ম্য। বর্তমানে কোনো একটি পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে হয়তো এটির সূত্রপাত হয়ে থাকে; কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও কোরবানির ঐতিহাসিকতা সম্পূর্ণরূপে মানব-সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ ত্যাগের উপাখ্যানের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে আছে। দুনিয়ার ইতিহাসে 'মুসলিম' নামকরণকারী বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব ও মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তদীয় পুত্র এবং মানবেতিহাসের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠতম পিতৃভক্ত ও পিতার আদেশের সামনে আনুগত্যের মস্তক শতভাগ অবনত করে দেওয়ার সাহসী দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সন্তান হজরত ইসমাইলের (আ.) মধ্যকার অনুষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক ও মর্মস্পর্শী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই কোরবানির প্রচলন সৃষ্টি হয়। এটি কোনো গতানুগতিক বা সাধারণ ঘটনা ছিল না; এটি ছিল আনুগত্য আর ত্যাগের মিশ্রণে ঐশী নির্দেশনা সংবলিত এক অবিশ্বাস্য ও শিহরণ-জাগানিয়া ঘটনা। পুরো বিষয়টিই মহান আল্লাহর সামনে আত্মোৎসর্গের অনবদ্য নজির স্থাপনের এক অনন্য দলিল।
পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে ছোট্ট সুরা আল কাউসারে মহান আল্লাহ বলেন- 'ফাসালি্ল লিরাবি্বকা ওয়ানহার' অর্থাৎ তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো। এ কোরবানির মানে গরু কোরবানি নয়; এটি হচ্ছে ত্যাগ স্বীকার, আত্মোৎসর্গের নজির স্থাপন করা। সেটি কেমন হবে তার ব্যাখ্যায় মহান প্রভু বলেছেন- 'ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাবি্বল আলামিন' অর্থাৎ নিশ্চিতভাবে আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার বেঁচে থাকা এবং আমার মরে যাওয়া- সবকিছুই মহান প্রতিপালকের জন্য উৎসর্গীকৃত। এখানেও কোরবানির মানে হলো সেকরিফাইস তথা আত্মোৎসর্গ বা পরম রবের জন্য আত্মনিবেদন। আর এই আত্মনিবেদনের ক্ষেত্রে নিজের সব আমিত্ব বিসর্জন দিতে হবে এবং খোদার রাহে নিজের সর্বাপেক্ষা প্রিয় জিনিসকেই উৎসর্গ করতে হবে। কোরআনে কারিমের চতুর্থ পারার প্রথম আয়াতে আমরা সে বিষয়ের নির্দেশনাই দেখতে পাই- 'লানতানালুল বির্রা হাত্তা তুনফিকু মিম্মা তুহিব্বুন' অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের প্রাণাধিক প্রিয় জিনিস মহান আল্লাহর জন্য নিবেদন করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটি পুণ্যময়তার বিষয় হবে না। অর্থাৎ খোদার রাহে সর্বোত্তম, সর্বাপেক্ষা প্রিয় এবং নিজের সবচেয়ে পছন্দনীয় ও ভালোবাসার সম্পদটিকেই উৎসর্গ করতে হবে। আজকের মুসলিম সমাজে বিদ্যমান কোরবানির এ ধারা প্রচলনের ইতিহাসের সঙ্গেও সেই সর্বোত্তম ও সর্বাপেক্ষা প্রিয়পাত্রকে উৎসর্গকরণের বিষয়টি বিমূর্ত হয়ে আছে। একজন পিতার কাছে তার সন্তানের চেয়ে প্রিয়পাত্র আর কী হতে পারে? তাও যদি আবার জীবনের সন্ধ্যাবেলায় একনিষ্ঠ প্রার্থনার ফলে সেই প্রিয়তম সন্তানকে লাভ করা হয়!
ইতিহাসের বিস্ময় পুরুষ ও পয়গম্বর হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর জীবনের ৮৬ বছর বয়সে চক্ষু শীতলকারী সন্তান হিসেবে হজরত ইসমাইলকে (আ.) পেয়েছিলেন। তাও আবার মহান প্রভুর ইচ্ছায় প্রিয়তমা স্ত্রী হাজেরাকে (আ.) নির্জন মরুভূমি আরবের মক্কায় নির্বাসিত অবস্থায় রেখে আসতে হয়েছিল; সেখানেই জন্ম নিয়েছিলেন হজরত ইসমাইল (আ.)। বার্ধক্যে উপনীত নবী ইবরাহিম (আ.) নবজাতককে দেখে সবেমাত্র সুখ-সম্ভোগের একটি অবস্থায় পেঁৗছেছিলেন আর এমতাবস্থায় পরবর্তী অসহনীয় ও বিভীষিকাময় নির্দেশটি প্রাপ্ত হন। শিশু ইসমাইল একটু একটু হাঁটাহাঁটি বা কিঞ্চিৎ দৌড়াদৌড়ির বয়সে উপনীত হলেন। এ সময়ই মহান আল্লাহ তাঁর মনোনীত নবী ইবরাহিমের (আ.) ধৈর্য এবং ত্যাগের সর্বোচ্চ পরীক্ষাটি নিতে চাইলেন। অবশ্য হজরত ইবরাহিমের (আ.) আগে থেকেই নানা পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে সর্বক্ষেত্রেই সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে আসছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন- ওয়া ইযিবতালা ইবরাহিমা রাব্বুহু বিকালিমাতিন ফাআতাম্মাহুন্না' অর্থাৎ মহান প্রতিপালক হজরত ইবরাহিমের (আ.) ক্ষেত্রে অনেক পরীক্ষা নিয়েছেন এবং তিনি (ইবরাহিম) সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। নবী ইবরাহিমের (আ.) জীবনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি এবারে সংগঠিত হলো- 'ইয়া বুনাইয়া ইনি্ন আরাফিল মানামি আনি্ন আজবাহুকা' অর্থাৎ ইবরাহিম (আ.) তাঁর পুত্রকে বললেন- হে আমার কলিজার ঠুকরো সন্তান, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি যেন তোমায় জবাই করছি। 'ফানযুর মাযা তারা' এমতাবস্থায় তোমার এ বিষয়ে মতামত কী? ইসমাইল বয়সে ছোট্ট হলেও পয়গম্বরের ছেলে এবং তিনি নিজেও পয়গম্বর। শিশু ইসমাইল ভাবলেন, আমার বাবা তো নবী আর নবীর কোনো স্বপ্ন সেটি তো আসলে স্বপ্ন নয়, তা হচ্ছে নিঃসন্দেহে অহির সমতুল্য। পয়গম্বরের প্রতি কোনো স্বপ্ন সেটিও মহান আল্লাহর আদেশ হিসেবেই ধর্তব্য। তাই শিশু ইসমাইল সেটি অনুধাবন করতে পেরে যে জবাব তাঁর বাবা ইবরাহিমকে (আ.) তখন দিয়েছিলেন, সেটিও বিস্ময়কর। তিনি বলেন- ইয়া আবাতিফআল মা তু'মার সাতাজিদুনি ইনশাআল্লাহু মিনাস্সাবেরিন' অর্থাৎ হে আমার পিতা, আপনার প্রতি যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা পালন করুন; নিঃসন্দেহে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পাবেন। এখানে লক্ষণীয়, ইসমাইল স্বপ্নের কথা বলেননি। তিনি বলেছেন, যা আদেশ করা হয়েছে অর্থাৎ তিনি জানতেন সেই আদেশটি মহান প্রতিপালকের; যার সামনে ইসমাইল জীবন দিতে কুণ্ঠিত নন। মানবেতিহাসে এমন ধৈর্যশীল, সাহসী আর আনুগত্যসম্পন্ন সন্তান দ্বিতীয়টি নেই। এরপর পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্যের চরম পরাকাষ্ঠা বহন করে মহান প্রভুর নির্দেশ বাস্তবায়নে যখন উদ্যত হলেন, পবিত্র কোরআনে কারিম সেই ঐতিহাসিকতাকে এভাবে চিত্রায়ণ করছে- 'ফালাম্মা আসলামা ওয়াতাল্লাহু লিলজাবিন' অর্থাৎ তাঁরা উভয়েই যখন আত্মসমর্পণ করল এবং পিতা তাঁর প্রিয় পুত্রকে জবাই করতে উদ্যত হলো, তখনই ঐশী আওয়াজ ইবরাহিমের (আ.) কর্ণগোচর হয়- ওয়ানাদাহু আইয়া ইবরাহিম কাদ সাদ্দাকতার রুইয়া ইন্না কাযালিকা নাজযিল মুহসিনিন' অর্থাৎ হে ইবরাহিম, তুমি অবশ্যই তোমার স্বপ্নে প্রাপ্ত আদেশকে বাস্তবায়ন করেছ আর আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। কীভাবে এলো সেই প্রতিদান? পিতা রাজি হলেন প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে কোরবানি করতে আর পুত্র রাজি হলেন পিতার ওপর প্রদত্ত আদেশকে কার্যে রূপায়িত করতে। আত্মোৎসর্গের এমন নজিরবিহীন ঘটনা মানবেতিহাসে বিরল। এমতাবস্থায় সেখানে জবাইকার্য তথা কোরবানি ঠিকই হলো, সেটি একটি পশু- যেটিকে ইসমাইলের স্থলে কোরবানির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল। সন্তানের স্থলে পশু কোরবানি করা হলেও বাস্তবিক অর্থে কিন্তু তা মহান আল্লাহর আনুগত্য বিষয়ক তাৎপর্যের ক্ষেত্রে কোনোরূপ গুরুত্ব হারায়নি; বরং গোটা মুসলিম মিল্লাতের ওপর এটিকে আত্মোৎসর্গের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবেই গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে কোরবানির এই বিধানকেই মহান প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের এক পবিত্র ইবাদত হিসেবে প্রচলন করে দেওয়া হয়েছে- যার মাধ্যমে দুনিয়ার মুসলমানরা তাদের প্রবল ঐকতানের এক অনবদ্য নজির স্থাপনেরও সুযোগপ্রাপ্ত হয়।
লেখক, গবেষক ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়