পার্থিব সালাত অপার্থিব প্রতিফল

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৯

মোহাম্মদ অয়েজুল হক

রবের ভালোবাসায় সিক্ত মানুষগুলো তার আপন প্রতিপালকের সঙ্গে গভীর রাতে, নির্জনে, নীরবে, নিভৃতে একাকী কথা বলে। কীভাবে কথা বলে! কী বলে? নবীজি (সা.) বলেন, তোমাদের কেউ যখন সালাত আদায় করে, তখন সে তার পালনকর্তার সঙ্গে গোপনে কথা বলে (বুখারি)। হাশরের ময়দানে আলল্গাহতায়ালা সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেবেন। ইমানের পরেই সালাত বা নামাজের গুরুত্ব। আলল্গাহতায়ালা সাত আসমানের ওপর ফরজ করেছেন। নবীজিকে (সা.) মেরাজের রাতে আলল্গাহতায়ালা সরাসরি সালাতের দায়িত্ব অর্পণ করে সব উম্মতের ওপর ফরজ করেন।

মসিবত, কষ্ট, ব্যথা, জাহান্নাম, আগুন! আল্লাহ বলে দিলেন, 'তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।' (সুরা বাকারা-৪৫)। শুধু নিজে নয়, রবের সঙ্গে বান্দার ভালোবাসার এ সেতুবন্ধ গড়তে আদেশ দিলেন, তোমার পরিবার-পরিজনকে সালাতের আদেশ করো এবং এর ওপর অটল থাক' (সুরা তোয়াহা :১৩২)। সালাতে জান্নাতের দরজা খুলে যাবে। দুনিয়ার জীবন সুন্দর ও পবিত্র হবে। জাহান্নাম থেকে মুক্তি মিলবে। রাসুলুলল্গাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে এরূপ পাবন্দির সঙ্গে আদায় করে, ওজু ও সময়ের এহতেমাম করে, রুকু-সেজদা উত্তমরূপে আদায় করে এবং এরূপ নামাজ আদায় করাকে নিজের ওপর আলল্গাহর হক মনে করে; তখন জাহান্নামের আগুন তাকে হারাম করে দেওয়া হবে (মুসনাদে আহমদ, ১৮৩৭২)।

নামাজ পড়লে দুনিয়ার সব খারাপ, অন্যায় কাজ থেকে আলল্গাহতায়ালা তাকে কুদরতি হাতে হেফাজত করবেন। যে ব্যভিচার, জুলুম করবে না, সুদ-ঘুষ থেকে নিজেকে গোটাবে; নেশা, খুন, রক্তপাত থেকে দূরে থাকবে, তার সব অন্যায় বর্জনের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের জীবন হবে কল্যাণময়।

'নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে' (সুরা আনকাবুত, ৪৫)। কোথায় স্মরণ! কেমন স্মরণ? দুনিয়া স্বপ্নের মতো এক ধোঁকার ঘর। মরীচিকার মতো এ পার্থিব জীবনে চোখের সামনে তরতাজা মানুষগুলো নিথর হয়। হারিয়ে যায়। তবু দুনিয়ায় মোহাচ্ছন্ন দুনিয়াদার। নামাজের ভেতর বাজার। নামাজের ভেতর সংসার। হায়, নামাজের ভেতর অশ্লীলতার ভাবনা! নামাজ পড়ে চোর চুরি করে। লেবাস, পোশাকে সুসজ্জিত নামাজি নামাজ পড়ে নগ্নতা, অশ্লীলতায় নিমজ্জিত! আলল্গাহতায়ালার পবিত্র ঘরে বাজারের মতো গল্পের আড্ডা বসে! তাদের স্মরণে রব অনুপস্থিত। 'সুতরাং দুর্ভোগ সেসব নামাজির জন্য, যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে উদাসীন' (সুরা মাউন ৪-৫)। 'তাদের পর এলো অপদার্থ উত্তরসূরিরা, তারা নামাজ নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুগামী হলো। তাই তারা অচিরেই মন্দ পরিণাম প্রত্যক্ষ করবে। কিন্তু তারা ব্যতীত, যারা তওবা করেছে এবং ইমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তারাই তো জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের প্রতি সামান্য জুলুমও করা হবে না' (সুরা মারইয়াম, ৫৯-৬০)।

অপদার্থ উত্তরসূরি কারা, যারা নামাজ নষ্ট করল। সারাজীবন নামাজ পড়া হলো, নামাজের ভেতর দু'ফোঁটা চোখের পানি ফেলে বলা হলো- কই রব, আমার এ ইবাদত শুধু তোমার। ভাবনায় এলো কই- আমি দাঁড়িয়েছি মালিক তোমার সামনে। আমি জানি তুমি তাকিয়ে আছ আমার দিকে!

হজরত আবুজর রাজি থেকে বর্ণিত- রাসুলুলল্গাহ (সা.) একদিন শীতকালে বের হলেন, তখন গাছের পাতা ঝরছিল। তিনি একটি গাছের ডাল ধরলেন। ফলে এর পাতা আরও বেশি ঝরতে লাগল। তিনি বললেন, মুসলিম বান্দা যখন ইখলাসের সঙ্গে আলল্গাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়ে, তখন তার গোনা এমনভাবে ঝরে পড়ে, যেমন এই গাছের পাতা ঝরে পড়ছে (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ২১৫৫৬)।

আমার ইখলাস, আমার তাকওয়া আমিই ডুবিয়েছি। ইবাদতে মানুষ দেখানো রিয়া নামক মারাত্মক গোনা ছড়িয়ে পড়ছে দিন দিন। সাহাবি হজরত ইবনে মাসউদ বলেন, পৃথিবীবাসীর কাছে নিজেদের পুণ্য কর্মগুলো গোপন রাখ; এখানে পরিচিত ও সমাদৃত না হয়ে তোমরা আকাশ জগতে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখ। আলল্গাহতায়ালা আমাদের পার্থিব সালাতগুলো তার মহব্বতের নূর দিয়ে ভরে দিন। সালাতের অপার্থিব প্রতিফল জান্নাত দান করুন।

hoque9203@gmail.com