পরচর্চা থেকে দূরে থাকি

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

মাহমুদ আহমদ

গিবত অর্থাৎ পরনিন্দা বা পরচর্চা এমন একটি ব্যাধি, যা একটি পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। প্রচলিত অর্থে অসাক্ষাতে কারও দোষ বলাকে গিবত বলে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, 'প্রত্যেক কুৎসাকারী ও দোষ-ত্রুটি অন্বেষণকারীর জন্য দুর্ভোগ' (সুরা আল হুমাযা :১)। হুমাযা অর্থ সেই ব্যক্তি, যে পরের অনুপস্থিতিতে তার দোষ বর্ণনা করে ও দুর্নাম রটায়। হুমাযা অর্থ সেই ব্যক্তি, যে অপরের অনুপস্থিতিতেও দুর্নাম করে, উপস্থিতিতেও দুর্নাম করে। এই দুটি দোষ সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলাকে বিনষ্ট করে দেয়। ছিদ্রান্বেষণ, কুৎসা রটনা ও গিবত এমন একটি বিষয়, যা বর্তমানে তথাকথিত সভ্য সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রত্যেককে গিবতের মতো জঘন্যতম পাপ থেকে নিরাপদ রাখুন। আমরা যেন গিবতকে ঘৃণা করি ও এর থেকে নিজেকে দূরে রাখি। আমাদের মাঝে এমন অনেকে আছেন, যারা গিবত করতে পছন্দ করেন এবং অন্যকে পেছন থেকে আক্রমণ করে থাকেন। তারা সামনাসামনি কথা বলতে ভয় পান। পেছনে কথা বলেন এ কারণে যে, তার উত্তর যেন তাকে আর না শুনতে হয়। আর নিয়ত যদি এমনই থাকে যে, আমরা পেছন থেকে গিবত করব, তাহলে এটি অনেক বড় গোনা। এর উদাহরণ দিতে গিয়ে কোরআন শরিফে আল্লাহতায়ালা বলেছেন : 'হে যারা ইমান এনেছ, তোমরা পরস্পর সন্দেহ করা থেকে বিরত থাক। কেননা কোনো কোনো সন্দেহ অবশ্যই পাপ। কারও ওপর গোয়েন্দাগিরি করো না এবং একে অন্যের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি নিজেদের মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? অবশ্যই তোমরা এটা ঘৃণা করবে। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ বারবার তওবা গ্রহণকারী ও কৃপাকারী' (সুরা আল হুজুরাত, ১২)।

আমরা যদি হাদিস শরিফের দিকে দৃষ্টি দিই তাহলে দেখতে পাই, রাসুলে করিম (সা.) গিবত করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং গিবতের ভয়াবহতা ও এর পরিণতি সম্পর্কেও মুসলিম উম্মতকে সতর্ক করেছেন। রাসুলে করিম (সা.) গিবত করাকে অপছন্দ করতেন; এমনকি একে ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্য বলে অবহিত করেছেন। প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার কথার দ্বারা সে কখনও কাউকে কষ্ট দেয় না এবং সে তার জিহ্বাকে নিজের আয়ত্তে রাখে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত- মহানবী (সা.) বলেছেন, 'মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।' অপর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, 'সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ হলো গিবত' (তিরমিজি)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- মহানবী (সা.) বলেছেন, 'গিবত হলো তুমি তোমার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে এমনভাবে আলোচনা করবে, যা শুনলে মনে কষ্ট পায়। কোনো এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি যা বলেছি তা যদি সত্য হয়, তাহলে কি তা গিবত হবে? তখন রাসুল (সা.) বললেন, 'তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তা হলে তা হবে গিবত এবং যদি মিথ্যা হয়, তাহলে তা হবে অপবাদ' (মুসলিম)।

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে মুসলমানদের পরিচয় এভাবে উল্লেখ করেছেন, 'রুহামাউ বাইনাহুম' অর্থাৎ তাদের পারস্পরিক আচরণ, মেলামেশায় কোমলতা, ভদ্রতা, নম্রতা, দয়া ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হয়ে থাকে। তাই লোকদের ভালো গুণ বর্ণনা করা উচিত আর মন্দ কিছু থেকে থাকলে তা প্রকাশ করায় বিরত থাকতে হবে। আমরা এটা করতে পারি, কারও কোনো দুর্বলতা থাকলে তা অন্যের মাঝে প্রকাশ না করে বরং তা সংশোধনের চেষ্টা করব এবং যার মাঝে দুর্বলতা রয়েছে, তাকে ব্যক্তিগতভাবে বোঝাব। অথচ আমরা এটা না করে এর উল্টোটা করি। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখে, আল্লাহতায়ালা পরকালে তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবেন' (তিরমিজি ও মুসলিম)। হজরত আবদুর রহমান ইবনে গনম (রা.) ও হজরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তারাই আল্লাহর উত্তম বান্দা, যাদের দেখলে আল্লাহকে স্মরণ হয়। পক্ষান্তরে তারাই আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দা, যারা গিবত করে বেড়ায়, বন্ধুদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে বেড়ায় এবং পূতপবিত্র লোকদের প্রতি অপবাদ আনতে প্রয়াস পায় (আহমদ ও বায়হাকি)। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে পরনিন্দা বা পরচর্চা থেকে বাঁচার তৌফিক দান করুন।

ইসলামী গবেষক
[email protected]