পড় তোমার প্রভুর নামে

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

পড় তোমার প্রভুর নামে

অমর একুশে বইমেলা

খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে আরবের অজ্ঞ সমাজে দীর্ঘকালের পুঞ্জীভূত তিমির রেখার মূলোৎপাটনে সর্বপ্রথম যে নির্দেশনা অবতীর্ণ হয়েছিল সেটি হলো- পড়া। কেননা পড়ার মধ্য দিয়েই অর্জিত হয় শিক্ষা আর শিক্ষার চূড়ান্ত ফলই জ্ঞান। তাই ঐশী প্রত্যাদেশে বলা হলো- পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমায় সৃষ্টি করেছেন। এভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে বদলে দিতে সর্বাগ্রে প্রদত্ত নির্দেশনা সংবলিত যে পবিত্র বাণী তার পাঁচটি বাক্যের চারটিতেই পড়া, শিক্ষা ও জ্ঞানের বিষয়ে অবতারণা করা হয়েছে। সেই পড়া, শিক্ষা ও জ্ঞান যখন মলাটবদ্ধ রূপ পরিগ্রহ করে তখন সেটিকেই আমরা কিতাব, বই, বহি বা গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করি। পবিত্র ইসলামে গ্রন্থের মর্যাদাও এখানেই নিহিত। ছয় হাজার ছয়শ' ছিষট্টি আয়াত সংবলিত মহান আল্লাহর অমীয় বাণীর সংকলন 'আল কোরআন' হচ্ছে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব, নির্ভুল এক মহাগ্রন্থ। ইসলামে গ্রন্থের মর্যাদা নিরূপণ বা এ বিষয়ে মতামত কিংবা আলোচনা পরিব্যক্ত করতে হলে প্রথমেই আমাদের সামনে মহাগ্রন্থ আল কোরআনের অবস্থানটিই পরিস্ম্ফুট হয়ে ওঠে। পবিত্র কোরআন শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষই শ্রেষ্ঠ মানুষের মর্যাদায় অভিষিক্ত। হজরত রাসুলে আকরাম (সা.) ইরশাদ করেছেন- 'খায়রুকুম মান তাআল্লামাল কোরআনা ওয়া আল্লামাহু' অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম, যে নিজে কোরআন শিখে ও অন্যকে শিক্ষা দেয়।

পবিত্র কোরআন ও এর শিক্ষার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট থাকার ফলে ব্যক্তির প্রাধান্য বা শ্রেষ্ঠত্বেও স্বীকৃতি যেমন প্রকাশ পায়, ঠিক তেমনি জগৎ ও জীবনবোধের বিষয়াবলিকে উপজীব্য করে এই মহাগ্রন্থের মর্মবাণীর আলোকে রচিত পৃথিবীর অপরাপর গ্রন্থগুলোর মর্যাদার পেছনেও মূল অনুঘটকের ভূমিকায় পবিত্র ও মহিমান্বিত এই কিতাবই রয়েছে। অর্থাৎ কোরআনে কারিমের মর্যাদার কারণেই অন্যান্য গ্রন্থের মর্যাদা। তবে সেই গ্রন্থকে নিশ্চয়ই সৃষ্টি ও মানবজ্ঞানের পরিপূরক হতে হবে। সেই গ্রন্থ যেন মানুষের জ্ঞানের চক্ষুকে উন্মোচিত করে নিজের ও সমাজের মধ্যকার অবস্থিত অজ্ঞতা ও পশুত্বকে বিলীন করতে পারে, সেই গ্রন্থ হবে জ্ঞানভাণ্ডারের খনি, সেই গ্রন্থের পাঠক যেন গ্রন্থটিকে পায় এক উপকারী, দয়ালু ও বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে, নিজেকে আরও বেশি করে জানতে, সমাজকে আরও বেশি করে উপলব্ধি করতে এবং সভ্যতায় আরও বেশি অবদান রাখতে সেই গ্রন্থ যেন অমূল্য আকর হিসেবে প্রতিভাত হয় এবং বর্তমান, অতীত আর ভবিষ্যতের সেতুবন্ধ হিসেবে যেন সেই গ্রন্থ কাজ করে- একটি মূল্যবান গ্রন্থের কাছে এগুলো মৌলিক চাহিদা। নানা বিষয়ের, বৈচিত্র্যের গ্রন্থ হতে পারে; কিন্তু তাতে সারবত্তা থাকবে। একই সঙ্গে গ্রন্থের উপজীব্য হবে মানুষ ও মানবসমাজ। ইসলামের কাছে তখনই সেই গ্রন্থ হয়ে উঠবে এক অসাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদেয় বস্তু।

মানুষকে যেসব প্রয়োজনীয় উপাদান স্মরণীয়-বরণীয় হতে সহায়তা করে, গ্রন্থ তার সফল গোড়াপত্তন করে দেয়। গ্রন্থ ব্যতীত মানুষ না বুঝবে নিজেকে আর না চিনতে পারবে পরিবেশ, প্রতিবেশ, সমাজ আর বিশ্বব্যবস্থাকে। গ্রন্থহীন জীবন অনালোকিত, অনুজ্জ্বল থেকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে। আর গ্রন্থের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট মানুষ হবে আলোকিত, সদা থাকবে পুলকিত, হবে সুসংগঠিত। মেধায়, মননে, প্রজ্ঞায় ক্রমে ক্রমে ছাড়িয়ে যাবে নিজেকে এবং একসময় নিজেকে তুলে ধরবে এক অনন্য অবস্থানে। রুচিশীল মানুষের কারখানা হলো গ্রন্থ, সৃজনশীলতার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে গ্রন্থ, বিশ্বের তাবত সমুদ্ভাসিত চিন্তা-চেতনার স্বর্গরাজ্য হলো গ্রন্থ। গ্রন্থ হলো বিশ্ব প্রেমিকের প্রেমাস্পদ আর গোটা পাঠক সমাজের প্রণয়পল্লী। প্রখ্যাত ইরানি কবি আব্বাস ইয়ামেনি শারিফ তার 'কেতাবে খুব' কবিতায় গ্রন্থকে জ্ঞানসমৃদ্ধ, অপরূপ বর্ণনাময় ও অতিশয় দয়ালু বন্ধু হিসেবে বিবৃত করেছেন। তিনি বলেন, একটি ভালো গ্রন্থ মানবজীবনের প্রয়োজনীয় কথামালার এক বিচিত্র গাঁথুনি, অজস্র উপদেশের ভাণ্ডার আর বর্ণনাতীত উপকারের আকর। বই এমন এক বিশেষ রত্ন- যা শুধুই মঙ্গল আনয়ন করে, কোনোরূপ ক্ষতির কারণ কখনোই হয় না। এমনই উপকারী অজস্র গ্রন্থের সম্ভারে ঋদ্ধ হয়ে প্রতি ফেব্রুয়ারিতে নব নব রূপে ফিরে আসে অমর একুশের প্রাণের গ্রন্থমেলা। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী চলে রকমারি গ্রন্থের এই মিলন মেলা। পৃথিবীর দেশে দেশে ক্ষুদ্র ও বৃহত্তর পরিসরে গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হলেও আমাদের গ্রন্থমেলার রয়েছে ভিন্ন আমেজ, নান্দনিক সৌন্দর্য, আলাদা বৈশিষ্ট্য, স্বতন্ত্র মর্যাদা আর ঐতিহ্যিক তাৎপর্য। আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষার এক বেদনাদায়ক ও সংগ্রামী ইতিহাসের সঙ্গে অমোঘ বন্ধনে জড়িয়ে থাকার কারণে জাতীয় চেতনার মহান ধারক ও স্মারক হিসেবেও এ গ্রন্থমেলা অনবদ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯৮৩ সালে শুরু হওয়া বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা আজ বাঙালির প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে। ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, সংস্কৃতি, কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, শিশুতোষ ও গবেষণাসহ নানা বিষয় ও বৈচিত্র্যে বিন্যস্ত গ্রন্থমেলার গ্রন্থাবলি। মেলার প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা, বই কেনা আর উপচেপড়া ভিড় প্রকারান্তরে এই মেলাকে আজ বাঙালির এক অন্যতম উৎসবে রূপান্তরিত করেছে। আর এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হলো বই অর্থাৎ বইকে আবর্তিত করেই গড়ে উঠেছে এই মিলন মেলা; যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে গ্রন্থের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। সময়ের চাহিদা পূরণে আজ মেলার প্রাঙ্গণ ও পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। অত্যধিক মানুষের ভিড় সামলাতে না পেরে ও প্রকাশকদের জন্য স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২০১৪ সাল থেকে গ্রন্থমেলাকে বর্ধমান হাউস থেকে সম্প্রসারিত করে তা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও বিস্তৃত করা হয়। হাজার গ্রন্থের এই সমাহার কেবল কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং মেলাকে কেন্দ্র করে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক নানা অনুষ্ঠানমালারও আয়োজন হয়ে থাকে। সেসব অনুষ্ঠানে বিজ্ঞজনরা তাদের আলোচনা ও অংশগ্রহণে গ্রন্থমেলাকে আরও অধিকতর তাৎপর্যমণ্ডিত করে তোলেন।

ইতিহাসখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও কবি উমর খৈয়াম বলেছেন- গ্রন্থ হচ্ছে অনন্ত যৌবনা। টলস্টয় মানবজীবনের অতীব প্রয়োজনীয় তিনটি জিনিসের উল্লেখ করেছেন, যার প্রথমটি বই, দ্বিতীয়টি বই এবং তৃতীয়টিও বই। বাঙালির জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ বলেন, আমাকে মারার জন্য ধারালো অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, শুধু বই থেকে দূরে রাখলেই চলবে। আর নর্মান মেলরের তো প্রার্থনাই ছিল যে, বই পড়া অবস্থায় যেন তার প্রয়াণ ঘটে। জীবনের জন্য যত কিছুর প্রয়োজন তার সবকিছুর যথারীতি আয়োজনের সমারোহ রয়েছে গ্রন্থে। তাই গ্রন্থের সঙ্গে আমাদের মেলবন্ধন সৃষ্টি করতে হবে। পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে আর সে জন্য নিদেনপক্ষে ক্রয়ের জন্য তৈরিকৃত প্রতিবারের মাসিক বাজারের তালিকায় সর্বশেষ আইটেম যেন হয় একটি বই। বইয়ের সঙ্গে সখ্য সবার হৃদ-মাজারে সৃষ্টি হোক, সবার মাঝে শুভ বুদ্ধির উদয় হোক এবং সভ্যতার আলোকমালায় উদ্ভাসিত হোক আমাদের পরিবেশ ও সমাজ।

গবেষক ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়