সামাজিক অবক্ষয় রোধে ইসলামের বিধান

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯      

আবু রুফাইদাহ রফিক

ধর্ষণের পর হত্যা সামাজিক অবক্ষয়ের চরম এবং নিকৃষ্টতম অবস্থা, যা অতিক্রম করছি আমরা। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই ভয়ঙ্করভাবে বেড়ে চলছে এই জঘন্য অপরাধ। কোনোভাবেই যেন থামানো যাচ্ছে না ধর্ষক-খুনিদের। ধর্ষণের খবর এখন নিত্যদিনের। ধর্ষণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না নারী-শিশু কেউ। বিপদের কথা হচ্ছে, আজকাল এহেন পাশবিক কাজ সমাজের কোনো গুরুত্বহীন শ্রেণি কিংবা নির্দিষ্ট কোনো মহল দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে না। বরং উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিও এখন এ পাশবিকতায় জড়িয়ে পড়েছে, যা সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। সমাজের প্রায় প্রত্যেক শ্রেণির লোক থেকেই এই মহাপাপের প্রমাণ মিলছে। গাড়ির চালক-হেলপার থেকে শুরু করে প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম- কেউ বাদ যাচ্ছে না এই অপকর্ম থেকে। যে শিক্ষক শ্রেণি মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে পরিচিত, তারাও আজ ব্যাপকভাবে এ পাপে লিপ্ত। সম্প্রতি শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে ধর্ষণ করার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। এমনকি নিজের লাম্পট্য ধামাচাপা দিতে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীকে পুড়িয়ে মারার ঘটনাও খবরের শিরোনাম হচ্ছে। অপরদিকে মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, যারা মানুষদের নৈতিকতার সবক দিচ্ছে, ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার জন্য ওয়াজ-নসিহত করছে, তারাও যখন এমন জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়, তখন সহজেই বোঝা যায়, সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় কতটা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে!

কিন্তু কেন হঠাৎ নৈতিকতার এই অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে? কেন এসব মানুষ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট কাজে লিপ্ত হচ্ছে? আর কেনই-বা তাদের অন্তর এ ব্যাপারে ভয়শূন্য? এসব প্রশ্নের জবাব অবশ্যই খোঁজা দরকার। অনেকেই বিচারহীনতার কথা বলছেন। ধর্ষণ ও খুনের বিচার যতটা দ্রুত ও নিরপেক্ষ হওয়ার কথা, তা যে হচ্ছে না, এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার নয়। কিন্তু এ কথাও মানতে হবে, শুধু ধর্ষণ আর খুনের বিচার করলেই এ অপরাধগুলো নির্মূল করা যাবে না। বিচারের পাশাপাশি দেখতে হবে কোন কারণে সমাজের সচেতন মানুষও এসব কাজে লিপ্ত হচ্ছে। অন্যায়ের প্রথম ধাপেই কেউ ধর্ষণ কিংবা খুন করে না। এগুলো অন্যায়ের চূড়ান্ত পর্যায়। এর আগে সে আরও এমন কিছু অন্যায় কাজ সংঘটিত করে, যেগুলোকে আমাদের বিচার ব্যবস্থায় অন্যায় মনে করা হয় না। নারী-পুরুষের অবাধ, লাগামহীন জীবনযাপন যার অন্যতম। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসলামের অনুশাসন মানা হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসলামের শিক্ষার ব্যাপক অনুশীলন থাকা জরুরি। শিক্ষকদের অন্যান্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নৈতিকতার প্রশিক্ষণও দেওয়া উচিত। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের এ শিক্ষাগুলোকে মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু ইসলামের শিক্ষা প্রচার করলেই এসব অন্যায় নির্মূল হয়ে যাবে- এমনটি আশা করা যায় না। এর প্রমাণ হচ্ছে, যারা ইসলাম শিক্ষা প্রচার করছে, তারাও এখন জড়িত হচ্ছে এই অপকর্মে। সুতরাং শিক্ষার পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।

জেনা-ব্যভিচারের যে শাস্তি ইসলাম নির্ধারণ করেছে, তা বলবৎ করতে হবে। পবিত্র কোরআনের সুরা নুরে ব্যভিচারের শাস্তি সম্বন্ধে বলা হয়েছে, 'ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী উভয়কে একশ' বেত্রাঘাত কর এবং আল্লাহর এ বিধান কার্যকর করতে গিয়ে তাদের প্রতি তোমাদের যেন কোনো প্রীতি স্পর্শ না করে, যদি তোমরা আল্লাহ এবং আখিরাতে বিশ্বাস রাখো। আর তাদের শাস্তি যেন একদল মুমিন প্রত্যক্ষ করে।' এটা হচ্ছে অবিবাহিত নারী-পুরুষের শাস্তি। বিবাহিত ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারীদের শাস্তি হচ্ছে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা, যার প্রমাণ হাদিস থেকে পাওয়া যায়। এ ছাড়া জেনা-ব্যভিচারের পরকালীন কঠিন শাস্তির ঘোষণা তো রয়েছেই। সেগুলো প্রচার করতে হবে সর্বত্র। অনেকে ব্যভিচারের শাস্তি সংবলিত ইসলামের বিধানকে নিষ্ঠুরতা মনে করে। অথচ এ বিধান কার্যকরের মাধ্যমে অনেক নিষ্ঠুরতা থেকে বাঁচা সম্ভব। তাতে হয়তো আজ যেসব মাসুম বাচ্চা পাশবিকতার শিকার হচ্ছে, ধর্ষণ শেষে ধর্ষক কর্তৃক নির্মম কায়দায় খুন হচ্ছে; এ নিষ্ঠুরতা আমাদের হয়তো দেখতে হতো না। এখন অনেকেই ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবি জানাচ্ছে, যা অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু তারা ব্যভিচারের শাস্তির কথা বলছে না। অথচ ব্যভিচার থেকেই ধর্ষণের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। এ জন্য ইসলাম শুরুতে ব্যভিচারের শাস্তির কথাই বলেছে। কারণ ব্যভিচার বন্ধ হলে বন্ধ হবে ধর্ষণ এবং ধর্ষণ শেষে খুন করার মতো নিষ্ঠুরতা।

আরবি প্রভাষক, জয়নারায়ণপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী