ইসলামে মিতব্যয়িতা

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

ড. মো. শাহজাহান কবীর

মিতব্যয়িতার অর্থ হচ্ছে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংযম অবলম্বন করা বা আয় বুঝে ব্যয় করা। 'ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন' করাও মিতব্যয়িতা। ইসলাম মানুষকে অপব্যয়, অপচয় ও কৃপণতা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে। মিতব্যয়িতার নির্দেশও দিয়েছে অসংখ্যবার। বিশেষ কোনো দিবসে নয়, সারা জীবনই মিতব্যয়িতার পথ অবলম্বন করা ইসলামের বিধান। বাড়াবাড়ি কিংবা সীমা লঙ্ঘন করা কোনোটিই ইসলামে অনুমোদিত নয়। মিতব্যয় মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি করে এবং অন্যকে সাহায্য করার পথ উন্মুক্ত করে। মিতব্যয়ীরা কখনোই নিঃস্ব হয় না। মিতব্যয়িতা ইমানদারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যমপন্থার জীবন দর্শন হচ্ছে ইসলাম।

এ প্রসঙ্গে মহান আলল্গাহতায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমের সুরা বাকারার ১৪৩ আয়াতে এরশাদ করেছেন :এমনিভাবে আমি তোমাদের মধ্যপন্থি সম্প্রদায় করেছি। মধ্যমপন্থা শুধু ব্যয়ের ক্ষেত্রেই নয় বরং কথাবার্তা, হাঁটাচলার ক্ষেত্রেও মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। এ প্রসঙ্গে সুরা লোকমানের ১৯ আয়াতে ইরশাদ হয়েছে :'পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু করো।' কথাবার্তা, হাঁটাচলায় মধ্যমপন্থার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ইসলামে। পবিত্র কোরআনুল কারিমের সুরা আল-আরাফের ৩২ আয়াতে অপচয় না করার নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ হয়েছে, 'তোমরা আহার ও পান করো আর অপচয় করো না; নিশ্চয় আলল্গাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।'

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)ও তাঁর সাহাবিদের অপচয় ও অপব্যয় না করার নির্দেশ দিতেন। একদা রাসুল (সা.) হজরত সা'দকে (রা.) অজুতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যয় করতে দেখে বললেন, 'হে সা'দ, অপচয় করছ কেন? হজরত সা'দ (রা.) বললেন, অজুতে কি অপচয় হয়? নবীজি (সা.) বললেন, হ্যাঁ, প্রবহমান নদীতে বসেও যদি তুমি অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করো, তা অপচয় (ইবনে মাজা)। অপচয় ও কৃপণতা কোনোটিই অনুমোদিত নয় ইসলামে। যারা অপচয় ও কৃপণতার পথ পরিহার করে মিতব্যয়িতার পথ অবলম্বন করবে, মহান আলল্গাহতায়ালা তাদের নিজের বান্দা হিসেবে উলেল্গখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে সুরা আল ফুরকানের ৬৭ আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, রাহমানের বান্দা তো তারাই, যারা অপব্যয়ও করে না আবার কৃপণতাও করে না। তাদের পন্থা হয় এ দুইয়ের মধ্যবর্তী। অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার। ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, সাদা-কালো, ছোট-বড়, সবাই এসবের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করলেও সামাজিক ও আর্থিক ভিন্নতার কারণে অনেকে এসবের সংস্থান করতে পারে না। কারও ভোগের পেয়ালা উপচে পড়ে আবার কারও হাঁড়ি শূন্যই থেকে যায়। কেউ কেউ নিজের জৌলুস প্রদর্শনে কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিনোদনে খরচ করছে লাখ লাখ টাকা আর তার পাশের একজন গরিব মানুষ হয়তো টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছে না। তাই আমাদের দায়িত্ব হবে অপব্যয় ও অপচয় না করে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের হক আদায় করা, হিসাব কষে জাকাত আদায় করা ও দান-সদকা করার মাধ্যমে মহান আলল্গাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা। পাশাপাশি সন্তানদের জন্য কিছু সঞ্চয় করাও ইসলামের শিক্ষা। সন্তানদের অন্য কারও মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, 'তোমাদের উত্তরাধিকারীদের অন্যের মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদের সচ্ছল রেখে যাওয়া উত্তম। মহান আলল্গাহতায়ালা আমাদের মিতব্যয়ী হওয়ার তৌফিক দান করুন।

সহকারী অধ্যাপক, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা