বাইতুল্লাহর মুসাফির তোমার গন্তব্য সর্বশ্রেষ্ঠ

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

অয়েজুল হক

হজের মৌসুম শুরু। বাংলাদেশ থেকেও বৃহস্পতিবার থেকে প্রথম হজ ফ্লাইট শুরু হয়েছে। দুনিয়ার সব প্রান্ত থেকে মানুষ লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ধ্বনিতে মালিক আল্লাহতায়ালাকে জানিয়ে দিচ্ছেন- রব, আমরা তোমাকে ভালোবাসি। বাইতুল্লার পথে রওনা মুসাফির, তাওয়াফে লাখো মানুষ। মক্কা ও মদিনার মাটি প্রাণবন্ত। যাদের হজ করার সামর্থ্য আছে, এমন সবার ওপর হজকে আল্লাহতায়ালা ফরজ করেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, 'মানুষের মধ্যে যে ব্যক্তি ইমানদার, কাবাঘরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়; তার ওপর আল্লাহর অধিকার হচ্ছে, সে যেন হজ করে (সুরা আল-ইমরান :আয়াত ৯৬)।

আয়াতে আল্লাহ সক্ষমতার কথা বলেছেন। সক্ষমতা বলতে তার টাকা-পয়সা থাকতে হবে, শারীরিক সুস্থতা থাকতে হবে। অর্থাৎ বাইতুল্লাহ শরিফ গিয়ে হজের হুকুম-আহকাম পালনের শারীরিক সক্ষমতা থাকলেই হলো। আধুনিক যুগে এটা অনেক সহজ হয়েছে। বিমানে চার-পাঁচ ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় গন্তব্যে। একসময় যেতেই সময় লাগত তিন থেকে ছয় মাস। মরুর দেশে প্রচণ্ড গরম। এখন মসজিদ, থাকার জায়গা, যানবাহন- সব তাপানুকূল পরিবেশ। আরাফা, মিনা, মুজদালিফা... একটু গরম পড়লেই ঠাণ্ডা পানি ছিটানো হয়। স্বেচ্ছাসেবীদের সেবা, চিকিৎসা সেবা। সব মিলিয়ে আধুনিক সময়ে হজ করা খুব কঠিন কাজ নয়। আরেকটু ভিন্নভাবে বললে, কাজ সহজ বা কঠিন হয় তার বুকে লালিত মহব্বত বা ভালোবাসার ওপর নির্ভর করে। একজন দিনমজুর প্রখর রোদে কাজ করে। কারণ সে তার পরিবারকে ভালোবাসে। একজন রিকশাচালক ঝড়-বৃষ্টি, দিন-রাত উপেক্ষা করে রিকশা চালায়। কারণ সে তার স্ত্রী-সন্তানদের ভালোবাসে। এত কষ্ট কেন! খাবার কিনতে হয়। ওষুধপাতি লাগে। সন্তানের লেখাপড়ার খরচ আছে। বাড়িতে ফ্যান ঘোরে, বাতি জ্বলে। তাই বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়। যদি বলা হয়, এগুলো না করলে কী হবে? উত্তর তো এটাই- আরে আমার ভালোবাসার বিবি, কলিজার টুকরো সন্তান কষ্ট পাবে। ধনীদের ব্যাপারটাও ভিন্ন নয়। টেনশন, রাতে ঘুম নেই, চিন্তা আর দুশ্চিন্তা, দৌড়াদৌড়ির কারণ এগুলোই। পার্থক্য উপকরণগুলো ভিন্ন। গরিবের খাবার খেতে হয়; ধনীরও খেতে হয়। খাবারের মান ভিন্ন। গরিবের বাড়িতে ফ্যান, ধনীর বাড়িতে এসি। টাকা আছে, সুস্থতা আছে তো চলো হজে যাই। যেতে বলেছেন সবকিছুর মালিক। সব ক্ষমতার ওপর সর্বশক্তিমান। যেতে হবে নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জনের নিয়তে।

আগের চেয়ে শতগুণ সহজ কাজটি সম্পন্ন করতে অনেকে অনীহা প্রকাশ করে। টাকা আছে; ধনী মানুষ অপেক্ষায় থাকেন, বুড়ো হলে হজে যাবেন। কেউ যান আলহাজ হতে। কেউ বিমানবন্দর থেকে শুরু করে, হজ শেষে দেশে আসার আগ পর্যন্ত সেলফি তুলতে তুলতে খুইয়ে ফেলেন আপন মালিকের সঙ্গে তার মহব্বত। হজ নামক হজ চলে। সেখানে মালিকের ভালোবাসা নেই। তার চিন্তা-চেতনায় একবারের জন্যও উঁকি দেয় না ইবাদতটা হওয়া চাই নিছক আল্লাহতায়ালার জন্যই। আল্লাহপাক যেন এ মানুষদেরই বললেন, এই আমার বান্দা, 'হজের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে। যে ব্যক্তি সেসব মাসে (ইহরাম বেঁধে) নিজের ওপর হজ অবধারিত করে নেয়, সে হজের সময় কোনো অশ্নীল কথা বলবে না, কোনো গুনাহ করবে না এবং ঝগড়া করবে না। তোমরা যা কিছু সৎকর্ম করবে, আল্লাহ তা জানেন' (সুরা বাকারা, ২ :১৯৭)।

ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়। একজন মানুষ তার কষ্টার্জিত টাকা, শ্রম ব্যয়, বাড়িঘর-আপনজন ত্যাগ করে এহরামের সাদা কাপড় গায়ে জড়িয়ে যখন যায়; আমি কাঁদতে দেখেছি। কেন কাঁদে? টাকার মায়ায়? অনেক কষ্ট হবে সেই ভয়ে? না। কাঁদার ভিন্ন এক কারণ। রহস্য। ওই যে, বাইতুল্লাহ। প্রিয় কাবা। ওই যে মদিনা। জীবনভর কাবার দিকে সেজদা করা। মালিকের হুকুম। হুব্বে বাইতুল্লাহ মিনাল ইমান। বাইতুল্লাহর মহব্বত বুকে লালন করাও যে ইমান। নবীজিকে দেখা হয়নি। না, স্বপ্নেও না। নবী আমার শুয়ে আছেন মদিনায়। ভালোবাসার নবীর পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। মালিকের হুকুমে মালিকের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। সাদা কাপড়-কাফন। বুকের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসার আর্তনাদ- সবকিছু ছেড়ে এসেছি। দেখো দেখো, আমি না তোমার প্রেমে সেই দূর বহুদূর থেকে ছুটে এসেছি। লাব্বাইক। মালিক, তোমার গোলাম দুনিয়ার সব আশা ছেড়ে, আপন ছেড়ে, জীবনের মায়া ছেড়ে মৃত মানুষের যেমন দুনিয়ার কোনো খায়েশ থাকে না; তেমনই সব বিসর্জন দিয়ে এই যে আমি, তোমার গোলাম। মালিক, তোমার সামনে হাজির। প্রশংসা তোমার, রাজত্ব তোমার। তোমার প্রশংসায়, তোমার রাজত্বে আর কোনো শরিক নেই।

এমন মানুষদের জন্যই আল্লাহপাকের ঘোষণা, 'নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে কেউ কাবাগৃহের হজ কিংবা ওমরাহ সম্পন্ন করে এই দুটির মধ্যে সাঈ করলে তার কোনো পাপ নেই। আর কেউ স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে সৎকর্ম করলে আল্লাহ তো পুরস্কারদাতা সর্বজ্ঞ' (সুরা বাকারাহ :আয়াত ১৫৮)। তারা সম্মানিত, তাদের গন্তব্যই সর্বশ্রেষ্ঠ।

hoque9203@gmail.com