ইসলাম :সম্প্রীতির বিশ্বজনীন জীবন বিধান

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

মহান আল্লাহ সৃষ্টি সংক্রান্ত তাঁর ক্ষমতা বিষয়ে বলেন- 'ইন্নামা আমরুহু ইযা আরাদা শাইয়ান আয়্যাকুলা লাহু কুন ফায়াকুন'। অর্থাৎ তাঁর (আল্লাহর) আদেশ শক্তি এমন যে, তিনি যখন কোনো কার্য সম্পন্ন করার ইচ্ছা পোষণ করেন, তখন শুধু বলেন- হয়ে যাও, আর তা সঙ্গে সঙ্গেই হয়ে যায়। তিনি আকাশ-জমিন সৃষ্টি করলেন। এতদুভয়ের বাসিন্দা হিসেবে ফেরেশতা ও জিন সৃষ্টি করলেন। কিন্তু এদের কেউই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় আসীন হতে পারেনি। সর্বত্র শূন্যতা, অপূর্ণতা; যা দূরীভূত হয় আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ সৃষ্টির মাধ্যমে। ফেরেশতাকুলের মতামতকে প্রাধান্য না দিয়ে মহান আল্লাহ সৃষ্টি করলেন ধরাপৃষ্ঠের প্রথম মানব হজরত আদমকে (আ.) এবং তাঁকে ঘোষণা করলেন সৃষ্টি-জগতের শ্রেষ্ঠ মাখলুক হিসেবে। আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা প্রদান করা হলো আদমকে (আ.)। এতে কেউ কেউ নাখোশ হলো; বিশেষ করে অভিশপ্ত শয়তান তাঁর পিছু লেগে গেল এবং বিভ্রান্তির বক্ররেখায় পেঁচিয়ে তাঁকে জান্নাত থেকে বিতাড়নের সব ব্যবস্থা করল। সৃষ্টির প্রথম মানব-যুগল হিসেবে আদম (আ.) ও তাঁর সঙ্গিনী হাওয়া (আ.) ধূলির ধরায় পা রাখেন। স্বর্গ থেকে তাঁদের অবতরণের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে মানুষের যাত্রা শুরু হয়। মহান আল্লাহ তাঁদের ও তাঁদের পরবর্তীকালে যাঁরা আসবেন সবার জন্য কর্মপন্থা নির্ধারণ করে দেন, যার আলোকে মানুষ তার প্রাত্যহিক জীবনাচার পরিচালনা করবে। এর নাম হেদায়েত, যা অনুসরণ করলে মানবজীবনে কোনো প্রকার ভীতি থাকবে না এবং মানুষ কখনও দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হবে না। বিশ্বে মানবজাতির ঐতিহাসিক এই যাত্রালগ্নেই ইসলামের শুভ সূচনা ঘটে। পরবর্তীকালে তারই ক্রমধারায় এ ভূপৃষ্ঠে নানা সময়ে প্রয়োজনীয়তার নিরিখে লক্ষাধিক নবী-রাসুলের আবির্ভাব ঘটে; যাঁদের সবার মূল সুর ছিল এক ও অভিন্ন।

ইসলামের পবিত্র মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে- আর অবশ্যই আমরা প্রতিটি জাতি-গোষ্ঠীর নিকট রাসুল প্রেরণ করেছি। পৃথিবীতে নবী-রাসুল প্রেরণের এই ধারাবাহিকতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন পয়গম্বর হলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.); ইসলামী জীবনবোধে উজ্জীবিত তাবত মানুষের কাছে তিনি মুসলিম মিল্লাতের পিতা হিসেবে স্বীকৃত। মহান আল্লাহ ও তাঁর সব নির্দেশের একান্ত ফরমাবরদার হিসেবে ইব্রাহিমের (আ.) আনুগত্য আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। পরম স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির বিশ্বাস ও আনুগত্যের মস্তক কতটুকু অবনত রাখতে হয়; বিশ্ব-ইতিহাসে ইব্রাহিম (আ.) তারই অবিশ্বাস্য সব নজির স্থাপন করে গেছেন। ইসলাম যদি হয় মহান আল্লাহর কাছে সত্যিকারের আত্মসমর্পণের ধর্ম, তবে ইব্রাহিম (আ.) জীবনের অপরিসীম ত্যাগ ও কোরবানির মাধ্যমে বহুবার সেই আত্মসমর্পণের অনবদ্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। স্বয়ং মহান আল্লাহ তাঁর এ আত্মোৎসর্গের স্বীকৃতি দিয়ে ঘোষণা করছেন-  ইব্রাহিমকে (আ.) অনেক বিষয়ে তাঁর প্রতিপালক পরীক্ষা নিয়েছেন। অতঃপর তিনি আনুগত্যের সব পরীক্ষায় যথাযথভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এরই পুরস্কারস্বরূপ মহান আল্লাহ তাঁকে গোটা মানবজাতিকে নেতৃত্ব দানের জন্য নির্বাচিত করলেন- নিশ্চিতরূপে আমি তোমাকে সমগ্র মানবজাতির নেতা বানাব। পরবর্তীকালে তাঁরই বংশধারায় মহান আল্লাহর মনোনীত দূতদের আগমনের ভেতর দিয়ে বস্তুত এই ঘোষণাই বাস্তব সত্যে পরিণত হয়েছিল। আর ইসলামের ইতিহাসে ইব্রাহিমের (আ.) স্থান অনেক ঊর্ধ্বে- 'মিল্লাতা আবিকুম ইবরাহিমা হুয়া সাম্মাকুমুল মুসলিমিন।' অর্থাৎ তোমাদের মিল্লাতের পিতা হলেন ইব্রাহিম; তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান। ইব্রাহিমের (আ.) প্রিয়তমা পত্নী হজরত হাজেরার গর্ভস্থ কৃতী সন্তান হজরত ইসমাইলের (আ.) অধস্তন বংশপরম্পরায় আগমন করেন মানবেতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামনীষী ও সর্বশেষ নবী-রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.); যাঁর মধ্য দিয়েই ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং পৃথিবীতে আগত নবুয়তি কাফেলারও পরিসমাপ্তি ঘটে।

ইসলামী জীবনবোধ ও ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের কাছে 'রব' হিসেবে স্বীকৃত। কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে- 'আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।' অর্থাৎ যাবতীয় প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর, যিনি জগৎসমষ্টির রব তথা পালনকর্তা। রবের অনেক সংজ্ঞা রয়েছে। তবে সহজবোধ্য সংজ্ঞায়নে আমরা বলতে পারি- 'কুল মাখলুকের যা কিছু প্রয়োজন, সবকিছুরই যিনি করেন আয়োজন, তিনিই হলেন রব। এ হিসেবে মহান আল্লাহ জানেন যে, সৃষ্টিজগতের কল্যাণে কখন কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ধরণী যখন পাপের ভার আর সইতে পারছিল না, ঠিক তেমনি এক সন্ধিক্ষণে মানবতার পরম বন্ধু ও ত্রাণকর্তা হিসেবে মহানবীর (সা.) আবির্ভাব ঘটে। শৈশব আর কৈশোরেই তিনি মহৎ সব গুণ ও বৈশিষ্ট্যের ধারক হয়ে ওঠেন। যৌবনে অমিত সম্ভাবনার শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে ব্রতী হন। পরিণত বয়সে মহান রবের নির্বাচিত সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গম্বরের সুউচ্চ অবস্থান থেকে মানুষ ও মানবতার কল্যাণে করণীয় সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রবন্ধের শিরোনামেই বলা হয়েছে, সম্প্রীতির বিশ্বজনীন জীবন বিধান। সম্প্রীতি ইসলামের চিরায়ত আদর্শ। বিশেষ করে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে ইসলাম বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মহানবী (সা.) হলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম উদাহরণ; ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে, পরিবার ও সমাজে, নানা জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে এবং বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে তিনি সম্প্রীতির অনবদ্য নজির রেখে গেছেন। এ ক্ষেত্রে মদিনার মসজিদে রাসুলের (সা.) উপস্থিতিতে একজন অমুসলিম কর্তৃক মলমূত্র ত্যাগের ঘটনাটি সামনে আনা প্রাসঙ্গিক হবে; যেখানে সর্বোচ্চ ভক্তি-কেন্দ্র উপাসনালয় অপবিত্র করার পরও মহানবী (সা.) সেই ব্যক্তির সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করেননি, তাকে কোনো আঘাত করতে দেননি এবং কাউকে ধমকি কিংবা বকা লাগাতেও অনুমতি দেননি। তিনি নিজেও সেই ব্যক্তিকে কোনোরূপ কটাক্ষ করেননি, বরং সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেছেন- এটি আমাদের ইবাদতের স্থান; এখানে ময়লা করলে তা আমাদের হৃদয়কে বেদনাহত করবে, আমরা অত্যধিক কষ্ট পাব। তাই ভবিষ্যতে আর মসজিদে এমনটি করবে না- এই বলে যখন আগন্তুককে বিদায় দেবেন তখনই সে বলে উঠল, আমি তো আখেরি নবীর এই ধৈর্য পরীক্ষা করার জন্যই এখানে এসেছি এবং এই কাজ করেছি। কেননা আমি জেনেছি, শেষ নবী যিনি হবেন, তিনি চরম ধৈর্য ধারণকারী ও সহনশীল হবেন। আমি সেটার প্রমাণ পেয়ে গেছি। তাই আর কোনো বিভ্রান্তির অবকাশ থাকল না। আমাকে পড়িয়ে দেন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।' মূলত মহানবীর (সা.) চারিত্রিক মাধুর্যে এই সম্প্রীতির অমূল্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকার ফলেই অসংখ্য মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।

মক্কা বিজয়ের ঘটনা এখানে বেশ প্রণিধানযোগ্য; যেখানে সম্পূর্ণ বিজয়ী বেশে প্রবেশের পরও তিনি তাঁর সঙ্গে কৃত অতীতের জঘন্য কর্মযজ্ঞের প্রতিশোধ না নিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ আর দলমত নির্বিশেষে সবার প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে সর্বত্র এক সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। যার ফলে ইসলাম এক দ্রুত বিস্তার লাভকারী ধর্ম তথা ঐশী জীবন বিধানে পরিণত হয়েছিল। 

লেখক ও গবেষক; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়